
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সারে কাউন্টি—যার সবুজ উপত্যকা, শান্ত নদী, আর ধোঁয়াটে ভোরের কুয়াশা যেন প্রাচীন কোন কবিতার দৃশ্যপট। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, এখানে জীবন চলে ধীরে, নিঃশব্দে। ছায়াঘেরা বনভূমির পাশে লম্বা রাস্তা বেঁকে চলে গেছে A3 হাইওয়ে ধরে। আর ঠিক এই রাস্তাটির পাশেই, কোবহামের পেইনশিল রাউন্ডআবাউটের কাছাকাছি, ২০০৩ সালের জানুয়ারির এক কনকনে শীতের দুপুরে আবিষ্কৃত হয়েছিল এক নীরব আর্তনাদ—একজন নারীর থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস, তার থমকে যাওয়া জীবন।
রুহেনা হক। বাংলাদেশের সিলেট থেকে বিলেতে পাড়ি জমানো হাজারো নারীর মতো রুহেনাও একদিন স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন এ দেশে একটি ভালো জীবনের আশায়। কিন্তু তার স্বপ্নটা ভাঙে অনেক আগেই—একটি গৃহস্থালি ঘরের অন্দরে, যেখানে ভালোবাসা নয়, রাজত্ব করত হিংস্রতা, সন্দেহ আর এক পুরুষের বিকৃত আত্মমর্যাদাবোধ। এই গল্প রুহেনার মৃত্যু নিয়ে নয়, এটি তার দীর্ঘ নিঃশব্দ সংগ্রামের, তার সহ্যশক্তির, তার ভালবাসার, এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রাণান্ত চিৎকারের দলিল।
রুহেনা হক জন্মেছিলেন সিলেট শহরে। তাঁর শৈশব কাটে সুরমা নদীর পাশে, যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে যায় মসজিদের ছায়া, আর বাগানে ফুটে থাকে বকুল আর কাঞ্চন ফুল। আশেপাশের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় দল বেঁধে, মাঠে খেলে বিকেল জুড়ে। রুহেনার সেই জীবন বদলে যায় যখন তার বিয়ে হয় শাহ মোহাম্মদ আজিজুল হকের সঙ্গে—এক ইংল্যান্ডপ্রবাসী যুবক। তার পিতা নিসার আলী থাকেন পূর্ব লন্ডনের মার্ডেল স্ট্রিটে। তাদের দেশের বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারী বাজার ইউনিয়নের চন্দরপুর গ্রামে।
১৯৭৭ সালে রুহেনা হক বিলেতে পা রাখেন, সঙ্গে এক নতুন জীবন, নতুন দেশ, নতুন ভাষা। কিন্তু লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের ইট-সিমেন্টের গলি তাঁকে মুক্তি দেয়নি। বরং ঘরের ভিতরেই শুরু হয় তাঁর বন্দিত্ব।

রুহেনা হকের বৈবাহিক জীবনটা ছিলো এক অনন্ত অন্ধকার গলি, যার শেষে ছিলো না কোন আলো, ছিলো না কোন উদ্ধার। আজিজুল হক বাইরে পরিচিত ছিলেন একজন “রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি” হিসেবে। তিনি কাউন্সিল নির্বাচনে দাঁড়ানোর মতো উচ্চাশা পোষণ করতেন। অথচ ঘরের দরজা বন্ধ হলেই তিনি রুহেনাকে বেধড়ক মারধর করতেন—সন্তানদের সামনেই, বিনা কারণেই।
কলহপূর্ণ দাম্পত্য জীবন এবং স্বামীর নিষ্ঠুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রুহেনা দীর্ঘ ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের মায়া কাটিয়ে ছয় বছর আগে স্বামী আজিজুল হকের কাছ থেকে ছেলেমেয়েসহ পৃথক ভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে নিয়ে রুহেনা হক তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ভাইদের সহায়তায় বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধ আর ছেলেমেয়েদের অকল্যাণের কথা ভেবে তিনি আজিজুল হকের কাছ থেকে পুরোপুরি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানোর সাহস পাচ্ছিলেন না।
তিনি আজিজুল হকের সঙ্গে কোনও প্রকার সংশ্রব রাখতে আগ্রহী ছিলেন না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি সারের এপসম এলাকায় ঘর নেন। দীর্ঘদিন আজিজুল হককে এই ঘরের ঠিকানাও দেওয়া হয়নি। কোর্টের অনুমতি নিয়ে সে মাসে দু’বার ছেলেমেয়েদের দেখার উদ্দেশ্যে হাজির হতো। কিন্তু রুহেনা হক স্বামীর সঙ্গে দেখা করতেন না। তিনি ভয়ে ঘরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতেন।
আজিজুল হক রুহেনার পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র আটকে রেখেছিলেন, যার ফলে রুহেনা ১৫ বছর ধরে বৈধ নাগরিক হয়েও দেশে ফিরতে পারেননি। সম্প্রতি তিনি পাসপোর্ট ফিরে পেয়ে ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির ফ্লাইটে দেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, ১৫ বছর পর বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদ করা। কিন্তু সে স্বপ্ন রয়ে গেল ধ্বংসস্তূপে।
২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার। রাতের আকাশে ছিল ম্লান চাঁদ, বাতাসে হিম। লন্ডনের এপসম এলাকার শান্তিপূর্ণ ঘরটি তখন নিঃশব্দে ঢেকে ছিল অজানা বিপদের ছায়ায়। রুহেনা হক নিজের ঘরেই ছিলেন, সন্তানদের খাওয়ানোর পর ছোট মেয়ের গালে চুমু দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখনই ফোন বাজে।
ফোনের ওপারে আজিজুল হক। সুর ছিল মোলায়েম। বলল, “ইয়াসিনের পাসপোর্ট নম্বরটা নিয়ে যাও, আমি নীচে আছি।” রুহেনা কিছুক্ষণ দ্বিধা করলেও, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজি হন। বাইরে বেরুনোর প্রাক্কালে রুহেনা হক তার মেয়েকে বলে যান যে, তার স্বামীর কাছে তিনি ছেলে ইয়াসিনের পাসপোর্ট নাম্বারটি আনতে যাচ্ছেন। সে রাতে তিনি আর ঘরে ফেরেননি।
রাত গভীর ছিল। ছেলেমেয়েরা একে একে ঘুমিয়ে পড়েছিল, ভেবেছিল মা বুঝি একটু পরেই ফিরে আসবেন। কিন্তু সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে যায়—রুহেনা তখনও ফেরেননি। উদ্বিগ্ন সন্তানরা চারদিকে খোঁজ শুরু করে পরে পুলিশকে জানায়। অবশেষে শুক্রবার দুপুরে কোবহামের একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে পুলিশ উদ্ধার করে রুহেনার নিথর দেহ। বিকেলের দিকে পুলিশ নিজেই এসে সন্তানদের জানায়—তাদের মা আর নেই।
পরদিন, ২৪ জানুয়ারি দুপুর ২টা ১৫ মিনিট। সারের কোবহাম এলাকার A3 স্লিপ রোডের পাশে ডাঙার মতো এক পরিত্যক্ত জায়গা। কয়েকজন শ্রমিক ট্রাফিক কন বসাচ্ছিলেন। হঠাৎ একজন চিৎকার করে ওঠেন—”Someone’s there!” কিছুটা দূরে, ঘাসের আড়ালে, পড়ে আছে এক নারী দেহ। হাতজোড়া কাঁপতে কাঁপতে উঠে আসে পুলিশের ফোন নম্বর: ৯৯৯।
পুলিশ আসে দ্রুত। ময়নাতদন্তকারী ড. ফ্রেডরিক হিল রিপোর্ট দেন: মাথায় ১৭টি আঘাত—একটি ছোট কুড়াল বা শক্ত ধাতব কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। মাথার ডান দিকের হাড় ভেঙে গিয়েছে। মৃত্যু হয়েছে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে, হয়ত ঘটনাস্থলেই।
তদন্তে উঠে আসে, আজিজুল হক রুহেনাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে কোবহামের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, নিরাপদ জায়গা খুঁজে তার দেহ একটি ডোবায় ফেলে দেয়। পুলিশ তাকে তার পপলারের বাসা থেকে গ্রেফতার করে এবং পূর্ব লন্ডনের একটি গ্যারেজ থেকে রক্তমাখা মার্সিডিজ গাড়িটি জব্দ করে।
আজিজুল হকের অতীতও ছিল কলঙ্কিত। আশির দশকে পূর্ব লন্ডনের পপলারে এক কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে আদালত তাকে দেড় বছরের কারাদণ্ড দেন। তিনি ছিলেন একজন রেজিস্টার্ড অপরাধী। মিনি ক্যাব ড্রাইভার হিসেবেও বহু নারী যাত্রীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন, যার কারণে বারবার চাকরি হারান।
গিল্ডফোর্ড ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রথম শুনানির পর ৩ ফেব্রুয়ারি মামলাটি স্থানান্তরিত হয় লন্ডনের ওল্ড বেইলি কোর্টে। বিচারক ছিলেন মিসেস জাস্টিস হ্যালেট।
প্রমাণের পাহাড় জমে—ফোন কল রেকর্ড, জিপিএস ট্র্যাকিং, রক্তমাখা অস্ত্র, ভিডিও ফুটেজ, সন্তানদের সাক্ষ্য।
প্রসিকিউটর ফিলিপ সেন্ট জন স্টিভেন্স বলেন, “আজিজুল হক রাগে অন্ধ হয়ে স্ত্রীকে গাড়িতে তুলে আনে, মাথায় একের পর এক আঘাত করে, এবং তার মৃতদেহ রাতভর লুকিয়ে রাখে।”
১৫ ডিসেম্বর ২০০৩—রায় ঘোষণা হয়: যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
রুহেনা হকের মরদেহের ময়না তদন্ত শেষে ২৮ জানুয়ারি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ৩০ জানুয়ারি পূর্ব লন্ডনের জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টিভেজা জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত মানুষ—নির্বাক, স্তব্ধ, শোকস্তব্ধ।
২০১৮ সালে বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কের “Dead Women Walking” শীর্ষক ডকুমেন্টারিতে রুহেনার কাহিনী তুলে ধরা হয়।









