সম্পাদকের পাতা

ভ্যানকুভার ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি: বাংলাদেশি চক্রের ডিজিটাল সন্ত্রাস

নজরুল মিন্টো

ডিজিটাল যুগে চোরেরা আর তালা ভাঙে না—তারা ভাঙে ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রাচীর। ক্লিক, স্ক্যান আর কোডের কৌশলে আজকের প্রতারকরা অনেক বেশি নিঃশব্দ, অনেক বেশি বিপজ্জনক। আধুনিক সাইবার অপরাধীরা এখন আর ছুরি বা বন্দুক নিয়ে হাজির হয় না; তারা আসে স্কিমার, ট্রোজান, কীবোর্ড লগার, কিংবা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মিথ্যা কথার ভান্ডার নিয়ে। আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত পরিচয়, এমনকি আত্মীয়ের নাম ও জন্মতারিখ—সবই হয়ে উঠেছে বাণিজ্যের পণ্য। ডার্ক ওয়েবে হাজার হাজার কার্ড ডেটা, ফেক আইডি টেমপ্লেট, এবং হ্যাক করা ব্যাংক লগইন বিক্রি হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।

একটি ফিশিং ইমেইলের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আপনার মাসের বেতন চুরির রাস্তা। একটি ATM-এর কার্ড রিডারে বসানো স্কিমার কেড়ে নিতে পারে আপনার সমস্ত সঞ্চয়। আর আপনি যখন যাচাই করতে ব্যস্ত, তারা তখন ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আপনার নামে অপরাধ করে চলেছে। শুধু তাই নয়, আজকের জালিয়াত চক্র ‘ডিজিটাল ক্লোন’ তৈরি করে—চিপযুক্ত কার্ড নকল করে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট-বাইপাস অ্যাপ ব্যবহার করে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়েও ফেক ফেস স্ক্যান তৈরি করছে নিরাপত্তা ভেঙে ঢোকার জন্য।

এই অদৃশ্য যুদ্ধে, অস্ত্র গুলি নয়—অস্ত্র হলো সফটওয়্যার, ম্যালওয়্যার, বিটকয়েন এবং একটি ক্লিক। আর সেই যুদ্ধের একটি ভয়ানক অধ্যায় রচিত হয়েছিল ভ্যানকুভারের বাংলাদেশি-কানাডিয়ান এক চক্রের হাতে। তাদের সেই গল্প, শুধু আর্থিক প্রতারণার নয়—বরং এক আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ছায়া ইতিহাস।

২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, এই চক্রটি কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল তাদের কার্ড স্কিমিং জাল। EMV স্কিমার, ডার্ক ওয়েব থেকে কেনা ডেটা, জাল লগইন পেজবিশিষ্ট ফিশিং সাইট এবং ক্লোনড কার্ড—সবমিলিয়ে একটি বিপজ্জনক সিন্ডিকেট। মাত্র দুই বছরে তারা প্রতারণার মাধ্যমে লুট করে নেয় ৫ লাখ কানাডিয়ান ডলার।

প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ। রাতের অন্ধকারে ATM-এ লাগানো হতো স্কিমার, আগের দিনের ডেটা নিয়ে বানানো হতো জাল কার্ড। এই কার্ড দিয়েই কেনা হতো Apple Store-এর ম্যাকবুক, Louis Vuitton-এর দামি ব্যাগ, কিংবা Walmart-এর গিফট কার্ড।

প্রধান ব্যক্তি মোহাম্মদ রহিম। ৩৫ বছর বয়সী, ঢাকার মিরপুরে বেড়ে ওঠা এক তরুণ। কানাডায় আসেন সেনেকা কলেজে পড়তে। একটি আইটি ফার্মে কাজ করতেন, কিন্তু ২০১৮ সালে চাকরি হারানোর পর বদলে যায় তার পৃথিবী। ডার্ক ওয়েবের ‘CardingKingz’ ফোরামে যোগ দেন। শুরু হয় সাইবার প্রতারণার তালিম। নিজের ল্যাপটপে প্রতিদিন রাত ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চালাতেন CardPro সফটওয়্যার।

দ্বিতীয় ব্যক্তি ২৮ বছর বয়সী আব্দুল্লাহ আল মামুন ছিলেন ভ্যানকুভারের এক প্রিন্টিং শপের কর্মী। ছাত্র ভিসায় ছিলেন, কাজের অনুমতি সীমিত। টিকে থাকার সংগ্রামে হাত বাড়ান অবৈধ দিকেই। তিনি বানাতেন ফেক ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইউটিলিটি বিল—সবকিছু যা দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যায়।

তার ফোন থেকে পাওয়া যায় Photoshop ফাইলে তৈরি ১৫০টির বেশি ফেক ID-এর টেমপ্লেট। পুলিশ জানায়, তিনি এই ডেটাগুলোর বিনিময়ে বিটকয়েন গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ, তিনি শুধু এই চক্রের নয়, আরও অনেক অপরাধী চক্রের জন্যও কাজ করতেন।

তৃতীয় ব্যক্তি শফিকুল একজন Uber চালক। তার কাজ ছিল এই জাল কার্ডগুলো নিয়ে দোকানে গিয়ে পণ্য কেনা। ডাকনাম ছিল ‘ক্লিন ফেস’—কারণ সে আগে কোনো অপরাধে ধরা পড়েনি। বাকি দুইজন নাসির উদ্দিন ও জাহিদ হাসান তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতো।

একবার, Louis Vuitton স্টোরে $৩,০০০ দামের ব্যাগ কিনতে গিয়ে দোকানিকে বলেছিলেন: “আমি একাধিক কার্ড ট্রাই করব, একটা তো কাজ করবেই!” এই উদ্ধত আচরণই শেষ পর্যন্ত স্টোর ম্যানেজারের সন্দেহ তৈরি করে, এবং খবর যায় ভ্যানকুভার পুলিশে।

এই চক্রটি চুরি করা অর্থ নগদে পরিণত করার জন্য প্রথমে তারা গিফট কার্ড কিনে Craigslist বা Facebook Marketplace-এ ৭০% দামে বিক্রি করত। দ্বিতীয়ত, তারা ফেক ID দিয়ে ব্যাংকে ড্রপ অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে অর্থ রাখত। এমনকি কিছু টাকা তারা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে পাঠানোর চেষ্টাও করে, যার অংশ বাংলাদেশে জমা হয়েছিল একটি ইসলামি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে—যার $১৫০,০০০ এখনও ফেরত আসেনি।

একদিনে তিনটি ম্যাকবুক কেনা নিয়ে Best Buy-এর সন্দেহ তৈরি হলে, পুলিশ Facial Recognition-এর সাহায্যে শফিকুলকে শনাক্ত করে। তারপর শুরু হয় বড় তদন্ত।

রহিমের ল্যাপটপ থেকে উদ্ধার হয় ১০০+ কার্ড ডেটা সংরক্ষিত এক্সেল শিট, CardPro সফটওয়্যার এবং MSR606 ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ রাইটার। আব্দুল্লাহর ফোনে পাওয়া যায় ফেক ID-এর ডিজাইন। ব্যাংকগুলি, বিশেষ করে RBC, দেখায় যে একাধিক সন্দেহজনক ট্রানজেকশন এসেছে একই IP থেকে।

ভ্যানকুভার পুলিশ (VPD) এবং কানাডিয়ান অ্যান্টি-ফ্রড সেন্টার যৌথভাবে তদন্ত করে এই চক্রকে ধ্বংস করে। অপরাধী চক্রকে আদালত দোষী সাব্যস্থ করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়। প্রধান অভিযুক্ত মোহাম্মদ রহিমকে ৫ বছর জেল + $১০০,০০০ জরিমানা (প্যারোল ২০২৫), আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ৩ বছর জেল ও পরে ডিপোর্টেশন, শফিকুল ইসলামকে ২ বছর জেল, ৫ বছরের জন্য ব্যাংকিং নিষিদ্ধ, নাসির উদ্দিন ও জাহিদ হাসান শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেলেও, সকলেই ইমিগ্রেশন জটিলতায় ভুগছেন।

বিচারক মেরি ক্লার্ক মন্তব্য করেন: “এটি কেবল অপরাধ নয়, একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল সন্ত্রাস। আপনারা কানাডার আর্থিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিলেন।”

এই মামলাটি কানাডায় অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আর্থিক অপরাধের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

ব্যাংকগুলি, বিশেষ করে RBC ও TD, ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ অর্থ ফেরত দেয়। ATM-এ ডাইনামিক CVV, বায়োমেট্রিক স্ক্যানার চালু হয়। এর ফলে, ভ্যানকুভারে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ২০২৩ সালের মধ্যে ৪২% কমে যায়।

কানাডার সরকার বিশেষ ‘Dark Web Monitoring Task Force’ গঠন করে। রহিম এখন BC জেলের সেলে বসে লিখছেন সাইবার অপরাধের আত্মজীবনী!


Back to top button
🌐 Read in Your Language