আইন-আদালত

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসিফের মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল

আলী আজম

ঢাকা, ১২ অক্টোবর- সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসিফ ইমতিয়াজ খান জিসাদের মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। আসিফের পরিবারের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর এ হত্যাকান্ডে জড়িত তারই শ্বশুরবাড়ির লোকজন। শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলছেন, ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন আসিফ। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা। এ ব্যাপারে কলাবাগান থানায় অপমৃত্যু মামলা হলেও পরে আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরীর আদালতে মামলা করেন আসিফের বাবা সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম খান দুলাল। মামলায় আসিফের স্ত্রী সাবরিনা শহীদ নিশিতা, শ্বশুর এ এস এম শহিদুল্লাহ মজুমদার, শাশুড়ি রাশেদা শহীদ ও শ্যালক সায়মান শহীদ নিশাতকে আসামি করা হয়েছে। আসিফের বাবার করা মামলাটির তদন্তভার পিবিআইকে দিয়েছে আদালত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর অর্গানাইজড ক্রাইমের পরিদর্শক মিজানুর রহমান জানান, আসিফ হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর কলাবাগান থানার কাঁঠালবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ১৬৩ নম্বর বাসার নবম তলা থেকে নিচে পড়ে যান ব্যারিস্টার আসিফ ইমতিয়াজ খান জিসাদ। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরে ১৭ সেপ্টেম্বর আসিফের বাবা দুলাল আদালতে হত্যা মামলা করতে গেলে তার জবানবন্দি নিয়ে কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন বিচারক। ২১ সেপ্টেম্বর কলাবাগান থানায় অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয় (মামলা নম্বর ১৪)। বাদীপক্ষের আইনজীবী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইকবাল হোসেন জানান, আসিফ ইমতিয়াজের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কথায় বাদী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পারিপার্শ্বিক ঘটনা, সুরতহাল রিপোর্ট ও আসামিদের আচরণে বাদী বুঝতে পেরেছেন, আসিফ লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেননি, বরং তাকে হত্যা করে ওপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার দিন আসিফের শ্যালক সায়মান শহীদ নিশাত সাংবাদিকদের জানান, আসিফ ও সাবরিনার সঙ্গে মাঝেমধ্যে পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে ঝগড়া হতো।

আসিফ মাদকাসক্ত ছিলেন। চার মাস উত্তরায় একটি রিহ্যাবেও ছিলেন তিনি। ঘটনার দিন রাতেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধে। একপর্যায়ে আসিফ নবম তলার বারান্দা থেকে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেন। আসিফের বাবা শহিদুল ইসলাম খান দুলাল জানান, সাহসী, মেধাবী, মানবিক মানুষ ছিলেন আসিফ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন। বার অ্যাট ল করেন লন্ডনে। তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের খ-কালীন শিক্ষক ছিলেন আসিফ। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অন্তর্ভুক্ত আইনের ডিগ্রি নেওয়ার একমাত্র বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজের (আইসিআইএস) শিক্ষকও ছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন:  আজ পাপিয়া দম্পতির অস্ত্র মামলার রায়

একই কলেজের ছাত্রী ছিলেন সাবরিনা শহীদ নিশিতা। ২০১৬ সালে পারিবারিকভাবে আসিফ ও সাবরিনার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, হাতাহাতি লেগেই থাকত। সম্প্রতি করোনা পরীক্ষা করে আসিফ ও তার শ্যালক সায়মানের রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। কিন্তু আসিফের স্ত্রী সাবরিনা ও শ্বশুর শহিদুল্লাহর রিপোর্ট আসে পজেটিভ। এ নিয়েও তাদের মধ্যে বেশ দ্বন্দ্ব হয়। গত ডিসেম্বরে আইন বিষয়ে পিএইচডি করার জন্য কানাডা সরকারের স্কলারশিপ পান আসিফ।

সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। আসিফের পারিবারিক সূূত্র জানায়, ১০ সেপ্টেম্বর মিরপুরে মা বেগম বুলবুল নাহার বকুলের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার কথা ছিল আসিফের। কিন্তু রাত বেশি হওয়ায় তিনি মিরপুরে না গিয়ে শ্বশুরবাড়ি কলাবাগানে যান। ফোনে মাকে আসিফ জানান, আগামীকাল সকালে দেখা হবে। হোটেল থেকে তিনি খাবার নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যান। রাত দেড়টা পর্যন্ত আসিফ ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। ওই দিন ফেনীতে কর্মরত আসিফের শ্বশুর শহিদুল্লাহকে খবর দিয়ে কলাবাগানের বাসায় আনা হয়। রাত ২টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে শ্বশুর-শাশুড়ি, স্ত্রী ও শ্যালক একত্রে আসিফের সঙ্গে ঝগড়া করেন। একপর্যায়ে তারা মারধর করেন আসিফকে। পরিবারের সন্দেহ, এর পরই আসিফকে ৯ম তলা থেকে ফেলে দেন আসামিরা।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

আর/০৮:১৪/১২ অক্টোবর


Back to top button
🌐 Read in Your Language