ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর- গ্রাহক পাওনা টাকা ফেরত দিতে চান, কিন্তু ব্যাংক নিচ্ছে না- এমন ঘটনা বিরল। জনগণের টাকাই মূলত ব্যাংকে আমানত রাখা হয়। কোনো ঋণ গ্রহীতা জনগণের এই টাকা আত্মসাৎ করলে ওই টাকা উদ্ধার করা ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি মামলার আসামি ও রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গ্রাহকরা ঋণের টাকা ফেরত দিতে চাচ্ছেন, কিন্তু নানা জটিলতায় সেই টাকা ব্যাংক নিচ্ছে না। বেসিক ব্যাংক সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামিরা আত্মসাৎকৃত টাকা ফেরত দিতে চান। এ নিয়ে তারা ব্যাংক ও দুদকের দ্বারস্থও হচ্ছেন। আত্মসাৎকৃত টাকা আদায়ে দুদক ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও ব্যাংক এর বিপরীত অবস্থানে।
একেক পক্ষের মত ও ব্যাখ্যার কারণে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর আমলে আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন দুদকের আইনজীবী।
বেসিক ব্যাংক সূত্র জানায়, গত বছরের ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ শীর্ষক সার্কুলার জারি করে। সার্কুলার জারির ৪-৫ মাসের মধ্যে দুদকের মামলার সঙ্গে জড়িত ১৫ জন ব্যাংক গ্রাহক তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। এরপর ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ দুদকের মামলায় জড়িত ওই ১৫ জনসহ মোট ৮২ জনকে ব্যবসায়ী নয়, দুর্নীতিগ্রস্ত উল্লেখ করে তাদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ড. আবুল হাশেম বলেন, দুদকের মামলার সঙ্গে জড়িত তৎকালীন ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের ব্যাপারে ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আইনগতভাবে কোন প্রক্রিয়ায় পাওনা টাকা আদায় করা যায়- এ ব্যাপারে শিগগির বোর্ড সভায় আলোচনা করা হবে। ব্যাংক যাতে আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধার করতে পারে- এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বোর্ড সভায় দেখা হবে।
দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকে ঋণের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন সেই গ্রাহকরা যদি সম্পূর্ণ দায় গ্রহণ করে ব্যাংকের বিধিবিধান মেনে ঋন পুনঃতফসিল করতে চায় তাহলে ব্যাংক তাদের সেই সুযোগ দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে একদিকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমবে; অন্যদিকে ব্যাংকের আয় বাড়বে। ওইসব গ্রাহকের ঋণ পুনঃতফসিলে বেসিক ব্যাংক আইনগত কোনো জটিলতা অনুভব করলে তারা এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বেসিক ব্যাংকের এমডি মো. রফিকুল আলম বলেন, গত বছরের ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি শাখা থেকে জারি করা ৫ নং সার্কুলারে বলা হয়, একজন গ্রাহক মোট খেলাপি ঋণের ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋন পুনঃতফসিলের আবেদন করতে পারবেন। যারা ব্যবসায় বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এই সুযোগ শুধু তাদের জন্য। খেলাপি গ্রাহকরা দুটি পন্থায় এই সুযোগ নিতে পারবেন। এর মধ্যে একটি হলো ‘এক্সিট’: এই এক্সিটের আওতায় এক বছরের মধ্যে সমুদয় পাওনা পরিশোধ করতে পারবেন। দ্বিতীয় সুযোগ ‘কিস্তি’র আওতায় সর্বোচ্চ দশ বছরের মধ্যে পাওনা পরিশোধের সুযোগ পাবেন।
বেসিক ব্যাংকের আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে সমকালকে বলেন, আসামিরা আত্মসাৎকৃত টাকা ফেরত দিতে চাইলে তাতে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে টাকা ফেরত দিলেও তারা অপরাধের দায় থেকে রক্ষা পাবে না। বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ৫৬টি মামলা দুদক তদন্ত করছে। এর সঙ্গে জড়িত কোনো আসামি টাকা ফেরত দিতে চাইলে তাদেরকে দুদকে আবেদন করতে হবে। তাদের আবেদন পাওয়ার পর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তাদের টাকা জমা দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দুদকই বলে দেবে কোথায় কীভাবে টাকা জমা দিতে হবে।
দুদক আইনজীবী আরও বলেন, বেসিক ব্যাংকের মামলাগুলো একাধিকবার হাইকোর্টে গেছে। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্টের বেশকিছু নির্দেশনা আছে। এই ঘটনায় দুর্নীতি হয়েছে বলে হাইকোর্টে প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় ঋণ গ্রহীতা ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের স্ট্যাটাস আলাদা। যারা গ্রাহক বা কোম্পানি মালিক তারা অ্যাবেটর (দুস্কর্মে সাহায্যকারী)। আর সংশ্নিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা নীতির প্রশ্নে অভিযুক্ত। তবে অপরাধে উভয়েরই দায় রয়েছে। যার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে আদালতে। এই পর্যায়ে অভিযুক্তরা টাকা ফেরত দিতে চাইলে দুদক তার আইন-বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবে।
দুদক সূত্র জানায়, বিআরপিডির সার্কুলার অনুযায়ী দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে। ব্যাংক দুদকের মামলার আওতাভুক্ত গ্রাহকদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না। অভিযুক্ত অধিকাংশ গ্রাহক ঋণ পুনঃতফসিল করে আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত দিতে চান। অভিযুক্তদের ঋণ মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুদক বাংলাদেশ ব্যাংককে বলেছে।
জানা গেছে, এরই মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত একজন গ্রাহক দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছেন, তাকে ঋণ পুনঃতফসিল ও ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হলে ব্যাংকের সমুদয় পাওনা পরিশোধ করবেন। অভিযুক্ত গ্রাহদের অনেকেই দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে একই কথা বলছেন। এ ব্যাপারে অনেক গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহী।
পুনঃতফসিল না করতে ব্যাংক পর্ষদের সিদ্ধান্ত : গত বছরের ১৬ মে বিআরপিডির ওই সার্কুলার জারির ৪-৫ মাস পর তৎকালীন ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ দুদকের মামলার সঙ্গে জড়িত ঋণ গ্রহীতাদের পুনঃতফসিলের সুযোগ না দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। অনিয়মিতভাবে ঋণ গ্রহণের অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হয়েছে, তাদেরকে প্রকৃত ব্যবসায়ী বা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলে পর্ষদ উল্লেখ করেছে। এ কারণে মামলা সংশ্নিষ্ট গ্রাহকদের সার্কুলারের আওতায় পুনঃতফসিলের সুযোগ দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছে বোর্ড।
১৫ জন গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় ১৭ কোটি টাকা : বিআরপিডির সার্কুলার জারির পর পরই দুদকের মামলার সঙ্গে জড়িত ১৫ জন গ্রাহক প্রায় ১৭ কোটি টাকা ডাউনপেমেন্ট জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করেছেন। ওই ১৫ জন গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা প্রায় আটশ কোটি টাকা। সার্কুলার জারির ৪-৫ মাস পর ব্যাংক তাদের পুনঃতফসিলের সুযোগ রহিত করে।
অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে পাওনা আদায়ের চেষ্টা : অর্থঋণ আদালতে মামলা করে দুদকের মামলায় অভিযুক্ত ঋণ গ্রহীতাদের সহায়ক জামানত বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে জামানত বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করা হয়েছে।
অন্য ব্যাংক মামলার আসামিদের সুবিধা দিচ্ছে : সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, বিআরপিডির ওই সার্কুলারের আওতায় বেসিক ব্যাংক দুদকের মামলার আসামিদের সুবিধা না দিলেও অন্যান্য ব্যাংক দুর্নীতি মামলার সঙ্গে জড়িত গ্রাহকদের একই সার্কুলারের আওতায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দিচ্ছে।
আদালত অপরাধের বিচার করবেন, ব্যাংক পাওনা আদায় করবে : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসিক ব্যাংকের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দুদকের মামলার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক গ্রাহকদের বিচার করবেন আদালত। বিআরপিডি সার্কুলারের আওতায় সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়ে ওইসব গ্রাহকের ঋণ পুনঃতফসিলকরণ করা হলে অনাদায়ী বিরাট অঙ্কের টাকা আদায় সম্ভব হবে। অনাদায়ী অর্থ আদায়ের এই বিষয়টি নির্ভর করছে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর।
সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর কার্যকালে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দুই মেয়াদে সব ধরনের নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এই দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ।
দুদক সূত্র জানায়, ভুয়া জামানত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ক্লিয়ারেন্স না থাকা, গ্রাহকের ব্যবসার অস্তিত্ব, ধরন, ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতা যাচাই না করেই ওই সময় ঋণ দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে বাচ্চু ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর অযোগ্য, অস্তিত্বহীন কোম্পানি মালিক, ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ও প্রধান কার্যালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তার যোগসাজশে গড়ে তোলা হয় অর্থ লোপাটের চক্র।
সূত্র জানায়, জালিয়াতি করে বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো হয় ২০১৩ সালে। পরে অভিযোগটি অনুসন্ধান করে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৫৬টি মামলা করে ২০১৫ সালে। ৫৬ মামলায় ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানাধীন আছে। সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। ৫৬ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত আদালতে কোনো মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
সূত্র: সমকাল
আডি/ ৩০ ডিসেম্বর









