পূর্ণ অবয়বে পদ্মা সেতু: মাদারীপুর-মুন্সীগঞ্জ পাল্টে যাচ্ছে
মাদারীপুর, ১১ ডিসেম্বর- সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু বৃহস্পতিবার পূর্ণ অবয়ব পেয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতল এই সেতুর ওপরের সড়ক ও নিচের রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সেতুর পুরো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এরপরই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে স্বপ্নের এই সেতু। এদিকে এই সেতুর কারণে মাদারীপুর, বিশেষ করে শিবচর এবং মুন্সীগঞ্জের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে।
বেশকিছু বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে শিবচরে। গড়ে উঠছে ভৌত অবকাঠামোর পাশাপশি বিভিন্ন শিল্প-কারখানা। পদ্মার দুই পারেই পর্যটনের বিশাল সম্ভানা তৈরি হয়েছে। এসব কর্মযজ্ঞের কারণে দুই পারের কর্মজীবী মানুষের শ্রমের মূল্য ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। পাশাপাশি বেড়েছে জমির দামও।
একেএম নাসিরুল হক জানান, পদ্মা সেতুর কারণে শিবচর তথা গোটা মাদারীপুরই পাল্টে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শিবচরে বেশকিছু মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী, শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শেখ রাসেল শিশুপার্ক, বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব নার্সিং ইন্সটিটিউট অ্যান্ড কলেজ, আইএইচটি ভবন, মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সার্কেল এএসপি অফিস কাম-বাসভবন, বেগম রোকেয়া কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলসহ ট্রেনিং সেন্টার ও ডে-কেয়ার সেন্টার, শিল্পকলা একাডেমি ভবন ও মুক্তমঞ্চ, শিবচর পৌর বাস টার্মিনাল, ট্রমা সেন্টার, শিবচর হাইওয়ে থানা, হাজী আবুল কাসেম উকিল দশ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, চৌধুরী ফাতেমা বেগম দশ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, হাইটেক পার্ক, উপজেলা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, অলিম্পিক ভিলেজ, রেজাউল করিম তালুকদার টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি এবং সিঙ্গাপুরের আদলে বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও আইকন টাওয়ার। প্রকল্পগুলোর মধ্যে কোনোটির কাজ শেষে হয়েছে। কোনোটি চলমান আছে। টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজটি সম্প্রতি উদ্বোধন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্য স্থানের তালিকায় এখনও শীর্ষ স্থানে আছে শিবচরের নাম।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আশির দশকের পশ্চাৎপদ এলাকার পতিত জমির মূল্য এখন আকাশচুম্বী। যে জমি শতাংশ বিক্রি হতো মাত্র ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। সেই জমির মূল্য এখন শতাংশ প্রায় ১০ লাখ টাকা। এখানকার দিনমজুরের পারিশ্রমিকও বেড়েছে। আগে শ্রমিকের ডেইলি মজুরি ছিল ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা। সেখানে তাদের মজুরি দাঁড়িয়েছে ৭শ’ টাকা। পদ্মা সেতুর জন্য সরকারের অধিগ্রহণে অনেকেরই নিজেদের ফসলি জমি ঘর-বাড়ি হারিয়ে যেমন তাদের ঠিকানা বদলে গেছে। তেমনি ন্যায্য টাকা পেয়ে আবার পরিবারের লোকদের ভাগ্যের পরিবর্তনও ঘটেছে।
এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও স্কুল-কলেজের উন্নয়ন হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাঁচাঘর ৩-৪ তলা পাকা ভবনে রূপ নিচ্ছে। এ ছাড়া সেতু চালু হলে মাদারীপুর তথা শিবচর হবে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। কৃষিনির্ভর শিবচরের মানুষ এখন পেশা বদলাতে শুরু করেছেন। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলগুলো এখন শহরের পরিণত হচ্ছে। ব্যক্তি উদ্যোগে এলাকায় জুট মিলসহ বিভিন্ন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাদারীপুর জেলা পরিষদের সদস্য আয়শা সিদ্দিকা জানান, পদ্মা সেতু ছাড়াও বৃহৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে এলাকার মানুষ সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। তারা সরকারকে জমি দিচ্ছেন। সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য বড় ধরনের ত্যাগ।
মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন জানান, পদ্মা সেতু ঘিরে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। এখানে বেশকিছু মেগা প্রকল্প হতে যাচ্ছে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শিবচর তথা মাদারীপুর একটি বড় পর্যটন এলাকায় রূপ নিতে পারে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাদারীপুর-১ (শিবচর)-এর মানুষ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যখনই কোনো প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তখন তারা কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি বা আপত্তি করেননি। এই সহযোগিতার জন্য শিবচরের জনগণকে সাধুবাদ জানাই।
লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি শেখ সাইদুর রহমান টুটুল জানান, লৌহজং তথা মুন্সীগঞ্জের মানুষের জন্য পদ্মা সেতু আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এলাকায় বিভিন্ন কলকারখানা থেকে শুরু করে নানা অবকাঠামো গড়ে উঠছে। গড়ে উঠছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি বেড়েছে জমির দাম। পদ্মা সেতুর গোড়ার মেদিনী মন্ডল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আশরাফ খান জানান, পদ্মা সেতু আমার ইউনিয়নের ওপর হওয়ায় আমি গৌরববোধ করছি। এই সেতুর কারণেই আমার এলাকার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এলাকার অনেক লোকেরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে পদ্মা সেতুতে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে আমাদের এলাকায়। লৌহজং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গণি তালুকদার বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে আমাদের এলাকায় নতুন নতুন কলকারখানাও তৈরি হতে শুরু করেছে। এই সেতুর কারণেই পদ্মার পারে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গীবাড়ী) আসনের এমপি ও সাবেক হুইপ অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, পদ্মা সেতুর জন্য এ অঞ্চলের মানুষের অবদান মনে রাখার মতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে তারা তাদের বাপ-দাদাসহ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্য এলাকাবাসীকে ধন্যবাদ জানাই।
আরও পড়ুন- শুধুই সেতু নয়, একটি আবেগের নাম
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু মুন্সীগঞ্জবাসীর জন্য নিয়ামতস্বরূপ। এ সেতুর কারণে আমার এলাকায় ইতোমধ্যেই অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আধুনিকতার স্পর্শ পেতে শুরু করেছে লৌহজংবাসী। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন আধুনিক আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা। নান্দনিক ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েটির অর্ধেকেরও বেশি মুন্সীগঞ্জের ওপর দিয়েই বয়ে গেছে। পদ্মা সেতুর কারণেই আমরা এত সুন্দর একটি মহাসড়ক পেয়েছি। এখন মাত্র আধা ঘণ্টায় এ অঞ্চলের মানুষ ঢাকায় চলে যাচ্ছে। বাড়িতে থেকেও অনেকে ঢাকা গিয়ে অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে এ এলাকায় অনেক কিছুই করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এগুলো হয়ে গেলে এ অঞ্চলের লোকদের নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কাজের জন্য তাদের আর চিন্তা করতে হবে না।
সূত্র: যুগান্তর
আডি/ ১১ ডিসেম্বর







