‘আসছি’ বলে আর আসা হলো না চবি শিক্ষকের
চট্টগ্রাম, ০৪ সেপ্টেম্বর – পছন্দের বাগানে পাখির কিচিরমিচির। নানা জাতের দেশি-বিদেশি গাছ। কয়েক ঘণ্টা আগেই বাগানটির সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষক আফতাব হোসেন। প্রিয় বাগানে গাছের পরিচর্যা করতে তাঁকে আর দেখা যাবে না। শুক্রবার রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেছেন। সেই সঙ্গে কান্নায় ভাসিয়ে গেছেন মা, স্ত্রী ও ৮ বছরের শিশুসন্তান, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের।
সবার সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক ছিল শিক্ষক আফতাবের। তাই তাঁর মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। তাঁকে হারানোর শোক যেন পুরো ক্যাম্পাসের বাতাসে বইছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ২০১১ সালে আফতাব হোসেন একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০১০ সালে ওই বিভাগের শিক্ষক ইসমত আরার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। মেহরাব হোসেন নামে তাঁদের ৮ বছরের এক ছেলে আছে।
ছেলেকে নিয়ে তিনি ঘুরতে পছন্দ করতেন। বন্ধু ইকবাল হোসেনের বাসায় প্রায়ই যেতেন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও সেখানে গিয়েছিলেন। ইকবাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রায়ই আফতাব তার ছেলেকে নিয়ে আসত। ছেলেরা খেলত, আমরা কথা বলতাম। ছেলেকে সব সময় সে আগলে রাখত।
শিক্ষক আফতাবের শ্যালক জানান, তার দুলাভাই অত্যন্ত মেধাবী মানুষ ছিলেন। সন্ধ্যার পর বালুছড়ায় এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার ১০ মিনিট আগেও স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তিনি বলেন, ‘১০ মিনিটের মধ্যে আসছি।’ শিক্ষক আফতাব আর আসেননি। স্ত্রী ইসমত আরাকে অন্তহীন অপেক্ষায় রেখে অসীমের পথে যাত্রা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখেই দুর্ঘটনার শিকার হন শিক্ষক আফতাব। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মোটরসাইকেল নিয়ে ইউটার্ন করার সময় সামনে থেকে আসা ব্যক্তিগত গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শী মোরশেদ বলেন, সম্ভবত স্যারের মোটরসাইকেল ঘুরানোর সময় শহরের দিক থেকে আসা গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিল। মাথায় গুরুতর আঘাত লেগে স্যার জ্ঞান হারান। আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) নেওয়া হয়। চিকিৎসকের ধারণা, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছিল শিক্ষক আফতাবের।
রাউজান থানার ওসি কামরুল আজম বলেন, ধারণা করছি ইউটার্ন নেওয়ার সময়েই দুর্ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষক আফতাব হাটহাজারী থেকে আসছিলেন। ধাক্কা দেওয়া গাড়িটি শহর থেকে আসছিল। চালককে আটক করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর বাসায় গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের আহাজারি। বৃদ্ধা মা ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী ইসমত আরা। বাবার গড়ে তোলা বাগানের সামনেই খেলছে ছোট মেহরাব। সে জানে না, তাঁর বাবা কখনো আর ফিরে আসবেন না! তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হবেন না!
দীর্ঘদিন ধরেই চবির ১ নম্বর গেটে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলে আসছিলেন চবি শিক্ষার্থীরা। ৩ বছরে চারটি পৃথক দুর্ঘটনায় সেখানে ৫ জন নিহত হয়েছেন। গত বছরের ২০ অক্টোবর বাসের ধাক্কায় সেখানে দুই শ্রমিক নিহত হন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ১ নম্বর গেট এলাকায় জেব্রাক্রসিং, ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এতে টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। তবে শিক্ষক আফতাব নিহত হওয়ার ১০ ঘণ্টার মধ্যেই তৈরি হয়েছে স্পিডব্রেকার ও জেব্রাক্রসিং। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিদুল আলমের তত্ত্বাবধানে কয়েক ঘণ্টাতে এ কাজ সম্পন্ন হয়। তিনি বলেন, সড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধানে এ কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। খুব দ্রুত ওভারব্রিজ তৈরির কাজও শুরু হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, ফুট ওভারব্রিজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সড়ক বিভাগকে আগেই দরখাস্ত দেওয়া হয়েছিল। তারা জানিয়েছেন, বাজেট পাস হলে কাজ শুরু হবে।
সূত্র: সমকাল
আইএ/ ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২









