
কানাডা নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নির্মল নীল আকাশ, দিগন্তজোড়া বরফে ঢাকা পাহাড়, ম্যাপল সিরাপের মিষ্টি গন্ধ, আর ভদ্র-শান্ত মানুষদের হাসিমাখা মুখ। কিন্তু এই দেশে পা দেওয়ার পরই আপনি আবিষ্কার করবেন- এখানে সবকিছুই একটু উল্টো!
পানির কল উল্টো (খুলতে গেলে ডানে নয়, বাঁয়ে ঘোরাতে হবে); তালার চাবি ঘোরাতে হয় উল্টো; এমনকি গাড়ি চালানোর সময় স্টিয়ারিং থাকে উল্টো (অর্থাৎ বাঁদিকে ড্রাইভিং সিট)। ব্যাপারটা এমন যেন আপনি এসে পড়েছেন কোনো ‘উল্টো রাজার দেশে’!
কানাডিয়ানদের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, এমনকি হাসির ধরনও একটু আলাদা। তাদের সেন্স অব হিউমার এতটাই নিখুঁত যে, আপনি প্রথমে বুঝতেই পারবেন না তারা মজা করছে নাকি সিরিয়াস! তাদের কাছে নিয়ম মানা যেমন পবিত্র, তেমনি নিয়ম ভাঙার মজাও আলাদা। আর এই নিয়মের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজারো অদ্ভুত, মজার গল্প।

যদি কোনো কানাডিয়ান আপনাকে বলে, “আপনার ড্রাইভিং… খুবই ইন্টারেস্টিং!”—বুঝে নিন, আপনি ভয়ংকরভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন! এটা নাকি পোলাইট সার্কাজম।
কানাডায় আপনি যদি কারো পা মাড়িয়ে দেন আপনাকে কিছু বলতে হবে না, সে-ই আপনাকে বলবে স্যরি। তার মতে, আপনার পায়ের নিচে তার পা কেনো গেলো?
ধাক্কা লেগে গেলেও আগে ‘সরি’ বলবে যে লোকটা ধাক্কা খেয়েছে! মনে রাখবেন সে কানাডিয়ান।
আপনাকে প্রথম দেখে যে হাসবে সে হতে পারে কোনো দোকানের সুন্দরি ক্যাশিয়ার, বাসের ড্রাইভার কিংবা রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কেউ। কানাডিয়ান কোনো তরুণী আপনার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিলেই ভাববেন না যে আপনাকে তার ভাল লেগে গেছে!
এ দেশে নতুন এসেই দোকানের নাম দেখে প্রথম ধাক্কাটা খাবেন। বড় একটি দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ‘কানাডিয়ান টায়ার’। আপনার মনে হবে এখানে হয়তো গাড়ির টায়ার ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখবেন বিস্কুট, চকলেট, খেলনা, টিভি থেকে শুরু করে ঘরের যাবতীয় সরঞ্জাম সবই সাজানো রয়েছে। এখানে আমাদের দেশের মতো ‘আসগর আলী সুপার মার্কেট’ কিংবা ‘নফিজা খাতুন ভ্যারাইটি স্টোর’ জাতীয় নাম দেখতে পাবেন না। কারণ, কানাডিয়ানদের এত কিছু লেখার বা পড়ার সময় নেই। তারা নামের চেয়ে মানের গুরুত্ব বেশি দেয়।

শুধু দোকানের নামেই নয়, কানাডার বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্কুলগুলোতে এমন ধরনের কোর্স রয়েছে যেগুলোর কথা শুনলে না হেসে পারবেন না। কোর্সের নাম ‘কুইট স্মোকিং’। ধূমপান ত্যাগ করতেও এখানে স্কুলে ভর্তি হতে হয়! তাও আবার ৯৫ ডলার দিয়ে। ‘লার্ন ব্রিজ’ অর্থাৎ তাসখেলার কোর্সও আছে- ৬৫ ডলারে। আমার এক বন্ধু বললো, ব্রিজ তো ফ্রি-তেই শেখা যায়। কিন্তু কানাডিয়ানদের আবার বিনামূল্যে শেখার ব্যাপারে আগ্রহ নেই। তাদের কাছে অ্যাকাডেমিক শিক্ষা হলো আসল শিক্ষা। সেই শিক্ষার বাইরে কিছু করলে তারা যেন স্বস্তি পায় না।
স্কুলের শিক্ষা কেমন তার একটা উদাহরণ দিই। একবার সেলুনে চুল কাটাতে গিয়ে দেখি নরসুন্দরী পানির স্প্রে হাতে নিচ্ছে। আমি তাকে বললাম, ‘পানি দিও না, আমার ঠান্ডা লাগে।’ সে সোজা বলে দিলো, পানি ছাড়া চুল কাটার নিয়ম নেই। তার বসকে ডাকলাম। বস এসে অনুরোধ করলেন, ‘কাস্টমার না চাইলে পানি দিও না’।
কিন্তু না! মেয়েটি গোঁ ধরে বসল, সে বলল, “I’m trained to do it this way.” মনে হলো যেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিচ্ছে। আর আমি তাকে প্রশ্নপত্র বদলে দিতে বলছি! অবশেষে সেদিন চুল না কেটেই ফিরে আসতে হলো। এই হলো একাডেমিক শিক্ষার নমুনা! স্কুলে যা শিখবে তার বাইরে এক পা যাবারও সাহস রাখে না।

কানাডার ফাষ্টফুড দোকানগুলোর নামেও বেশ মজা লুকিয়ে রয়েছে। যেমন ‘সাবওয়ে’ শুনে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে। আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনের সাবওয়ে, না খাবারের দোকান- কোনটা আসল?
আরেকটি দোকানের নাম ‘মিষ্টার সাব’। এ দোকানের বিশেষ একটি খাবারের নাম ‘সাবমেরিন’। যুদ্ধজাহাজ মনে হলেও আসলে এটি বড় লম্বা এক ধরনের স্যান্ডউইচ। পেটের যুদ্ধে ব্যবহৃত এক বিশেষ খাদ্যবাহন। লম্বা রুটি কেটে তার মধ্যে নানা রকম মাংস, লেটুস, চিজ, সস ইত্যাদি দিয়ে বানানো হয় এই ‘সাবমেরিন’।
এ নিয়ে মজার একটি গল্প শুনেছিলাম। এক ব্যক্তি টরন্টো থেকে দেশে গিয়ে বিয়ে করতে গেছেন। পাত্রীপক্ষ জানতে চাইলো জামাই কানাডায় কি কাজ করেন? ঘটক বললো, তিনি কানাডায় সাবমেরিন তৈরি করেন। ব্যাস, আর কী লাগে? যথারীতি বিয়ে হয়ে যায়। কানাডায় এসে মেয়ে দেখলো তার স্বামী বড় বড় টুনা স্যান্ডউইচ তৈরি করেন ‘সাবমেরিন’ রেস্টুরেন্টে!

আমরা যখন ঠান্ডা পড়লেই চা বা কফির দোকানে ভিড় করি। কানাডিয়ানরা ঠিক উল্টো। তারা ঠান্ডার সময় আইসক্রিম খায়। তাদের যুক্তি হলো, “ঠান্ডায় আইসক্রিম গলে যায় না, তাই স্বাদটা বেশি থাকে!” আমরা যখন ৫ম স্তরের কাপড় পরেও কাঁপতে কাঁপতে বাইরে যাই তখন তারা বরফের স্তুপে গিয়ে ছবি তোলার ফটোশ্যুট করে। তারা বরফকে এমনিভাবে আপন করে নিয়েছে।
কানাডার উত্তরের রাজ্যগুলোতে এমন এক ধরনের হোটেল আছে, যেগুলো পুরোপুরি বরফ দিয়ে তৈরি।অতিথিরা এখানে আসেন ঘুমানোর জন্য। বরফের বিছানায় ঘুমান, বরফের গ্লাসে জুস পান করেন। ইচ্ছে আছে যদি কোনোদিন সুযোগ হয় তাহলে দেখবো বরফের ঘরের ঘুমাতে কেমন লাগে!

কানাডা এক জাদুময় রাজ্য, যেখানে প্রথমদিকে সবকিছুই উল্টো মনে হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আপনি বুঝবেন—এই উল্টো নিয়মগুলোই আপনাকে গুছিয়ে দেয়। এখানে নিয়ম মানে নিরাপত্তা, হাসি মানে আন্তরিকতা।
এই দেশ আপনাকে শেখাবে কীভাবে ঠান্ডার মধ্যে উষ্ণ থাকতে হয়, কীভাবে অচেনাকেও আপন ভাবতে হয়, আর কীভাবে ‘উল্টো’ হলেও এক সুন্দর নিয়মমাফিক জীবন বয়ে চলে।









