সম্পাদকের পাতা

নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হাসিব ফাতমীর জয়

নজরুল মিন্টো

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হাসিব ফাতমী

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অঙ্গরাজ্য নর্থ ক্যারোলাইনা। আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল থেকে অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাজ্যের আইনসভায় এবার ভোটারদের রায়ে নিজের জায়গা করে নিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী হাসিব ফাতমী। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্টেট সিনেটের ১৮ নম্বর আসনে জয় পেয়েছেন এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। প্রকাশিত বেসরকারি ফল অনুযায়ী, তিনি পেয়েছেন ৫৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান ক্রিস স্টক পেয়েছেন ৪২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন লিবার্টারিয়ান প্রার্থী ব্র্যাড হেসেলও। গত মে মাসে শূন্য আসনে নিয়োগ পেয়ে স্টেট সিনেটে দায়িত্ব নিয়েছিলেন হাসিব। এবার সরাসরি নির্বাচনে জিতে পূর্ণ মেয়াদে সেই দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেন তিনি।

পুরো গ্র্যানভিল কাউন্টি এবং ওয়েক কাউন্টির উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত আসনটিতে ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ১২৮ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন ডেমোক্র্যাট টেরেন্স এভারিট। এবার রিপাবলিকান ক্রিস স্টকের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ পয়েন্ট বেশি ভোট পেয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে রাখলেন হাসিব।

৩৮ বছর বয়সী হাসিবের পরিবারের শিকড় বাংলাদেশের নোয়াখালীতে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ বদরুল এহসান ফাতমী এবং মা সাইদা ফাতমী স্নিগ্ধা। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁরা। ১৯৮৮ সালে নর্থ ক্যারোলাইনার ডারহামে জন্ম হয় হাসিবের।

হাসিবের মা ওয়েক কাউন্টির সরকারি বিদ্যালয়ে কিন্ডারগার্টেনের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। হাসিবও পড়েছেন সেখানকার সরকারি বিদ্যালয়ে। পরে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। ২০০৯ সালে স্নাতক শেষ করে যান নিউইয়র্কের ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০১২ সালে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন। নিজের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকার কথা তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।

আইনপেশায় এসে মানুষের আর্থিক ও সামাজিক সংকট কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় হাসিবের। যুক্তরাষ্ট্রের সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে কাজ করেছেন। পরে দেউলিয়াসংক্রান্ত মামলা পরিচালনাকারী একজন ফেডারেল বিচারকের অধীনে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন চিকিৎসার ঋণে জর্জরিত পরিবার এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পড়া কৃষকদের বিপন্ন জীবন। নাগরিক অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিতে বিনা পারিশ্রমিকেও কাজ করেছেন তিনি। মায়ের পথ অনুসরণ করে শিক্ষকতাতেও যুক্ত হন। ক্যাম্পবেল ল স্কুলে শিক্ষার্থীদের আদালতে মামলা পরিচালনার কৌশল শিখিয়েছেন।

জনসেবার সঙ্গে হাসিবের সম্পর্ক অবশ্য নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার অনেক আগে থেকে। ক্যাপিটাল এরিয়া টিন কোর্টের সঙ্গে ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি। আইনের সংস্পর্শে আসা কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ দিতে কাজ করা এই কর্মসূচিতে তিনি প্রথমে কিশোরদের পক্ষে এবং পরে বিচারকের ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতিতে এসে ওয়েক ফরেস্ট টাউনের কমিশনার নির্বাচিত হন। টেরেন্স এভারিটের পদত্যাগে শূন্য হওয়া আসনে ২১ মে দায়িত্ব নেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারে হাসিব গুরুত্ব দিয়েছেন সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় কমানোর ওপর। জ্বালানি ও চিকিৎসার খরচ হ্রাস, কর্মজীবী পরিবারের করের চাপ কমানো, সরকারি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো ছিল তাঁর অগ্রাধিকারের মধ্যে। শিশুদের বিদ্যালয়ে সকালের খাবার ও দুপুরের খাবারের কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

হাসিবের এই জয়ের পাশাপাশি এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটে দুই স্বতন্ত্র মিত্রসহ তাদের আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪টিতে, রিপাবলিকানদের ৪৪টি। প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের সীমা অতিক্রম করেছে ডেমোক্র্যাটরা। কিছু আসনের ফল তখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় দুই দলের চূড়ান্ত আসনসংখ্যা নির্ধারিত হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে হাসিবের এই জয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাফল্যের তালিকায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

তথ্যসূত্র: North Carolina General Assembly, NC Newsline

Back to top button
🌐 Read in Your Language