
২০১৮ সালের ঘটনা। যুক্তরাজ্যে সরকারি ভাতার জন্য আবেদন করতে গিয়ে এক ব্যক্তি অপ্রত্যাশিত সমস্যায় পড়েন। সরকারি দপ্তরে তাঁর নামে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যা দেখে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে আগেই সরকারি ভাতার আবেদন করা হয়েছে। অথচ আবেদনকারী নিজেই জানতেন না, তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কেউ ব্যবহার করছেন। ঘটনাটি তদন্তের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য। শুধু একজন নন, পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ২৬ জনের পরিচয় ব্যবহার করে বছরের পর বছর সরকারি ভাতার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। তদন্তে সেই ব্যক্তির পরিচয়ও পাওয়া যায়। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আতিকুর রহমান।
যুক্তরাজ্যের কেন্ট কাউন্টির মারগেটে বসবাস করতেন ৩৪ বছর বয়সী আতিকুর। পেশায় ছিলেন একজন ডেলিভারি চালক। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর ধরে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এ সময় ৪০টির বেশি ভুয়া আবেদন জমা দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার পাউন্ডের বেশি। শেষ পর্যন্ত গত ৩০ অক্টোবর ক্যান্টারবেরি ক্রাউন কোর্ট তাঁকে ৪০ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
আতিকুরের প্রতারণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তিনি অপরিচিত মানুষের পরিচয় সংগ্রহ করার পরিবর্তে নিজের কাছের মানুষদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে যাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করতেন, তাঁদের পরিচয়ই হয়ে উঠেছিল প্রতারণার প্রধান উপায়। কারও নামে দেখানো হয়েছে চাকরি, কারও জন্য তৈরি করা হয়েছে কাল্পনিক নিয়োগকর্তা। এমনকি সরকারি ভাতা পাওয়ার জন্য কাগজপত্রে এমন সন্তানের তথ্যও দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই।
যুক্তরাজ্যে স্বল্প আয়ের মানুষ, কর্মহীন ব্যক্তি, সন্তান লালনপালনকারী পরিবার এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর্মজীবী নারীদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন সরকারি ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, মাতৃত্বকালীন ভাতা, চাইল্ড বেনিফিট এবং ট্যাক্স ক্রেডিট। আতিকুর এই চার ধরনের সরকারি সহায়তাকেই প্রতারণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। ভুয়া চাকরি, কোম্পানি ও সন্তানের বিবরণ দিয়ে এমনভাবে আবেদনগুলো তৈরি করা হয়েছিল, যেন সেগুলো প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছ থেকেই এসেছে।
এভাবে বছরের পর বছর চলতে থাকে প্রতারণা। কিন্তু ২০১৮ সালে একজন প্রকৃত সুবিধাভোগী নিজের নামে আবেদন করতে যাওয়ায় হিসাবের গরমিল ধরা পড়ে। সরকারি কর্মকর্তাদের সন্দেহ থেকে শুরু হয় অনুসন্ধান। পরে যুক্তরাজ্যের কর্মসংস্থান ও পেনশন বিভাগ ডিডব্লিউপির তদন্তকারীরা আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করে একের পর এক ভুয়া আবেদন শনাক্ত করেন। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের নামে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর সঙ্গে আতিকুরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হতে থাকে প্রতারণার ব্যাপ্তি।
২০২১ সালের অক্টোবরে এইচএমআরসির কর্মকর্তারা মারগেটে আতিকুরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারের পরও মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আতিকুরের বিরুদ্ধে পাঁচটি প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়। আদালতে তিনি অভিযোগগুলোর দায় স্বীকার করেন।
অবশেষে ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর, শুক্রবার। কেন্টের ক্যান্টারবেরি ক্রাউন কোর্টে আতিকুর রহমানের সাজা ঘোষণা করা হয়। আদালত তাঁকে তিন বছর চার মাসের কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে আগামী আট বছরের জন্য কোনো কোম্পানির পরিচালক হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
এই মামলার রায়ের পর যুক্তরাজ্যের উদ্ভাবন, জালিয়াতি ও তথ্যবিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান গ্রিনউড আতিকুরের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যাঁরা আতিকুরকে বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের সেই বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করলে প্রকৃত সাহায্যপ্রার্থী মানুষ এবং গুরুত্বপূর্ণ জনসেবার জন্য বরাদ্দ অর্থের ক্ষতি হয়। তদন্তকারীদের কাজের প্রশংসা করে তিনি জানান, সরকারি ভাতা নিয়ে প্রতারণা বন্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
আতিকুর রহমানের এই ঘটনা শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি কাছের মানুষের বিশ্বাস ভাঙারও একটি উদাহরণ। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তিনি এমন সব সরকারি সুবিধা নিয়েছেন, যেগুলোর জন্য প্রকৃত আবেদনকারীরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে অর্থ পাওয়ার অধিকারী হন। তাঁর প্রতারণা ধরা পড়ার পেছনে রয়েছেন একজন প্রকৃত আবেদনকারী। ওই ব্যক্তি নিজের নামে সরকারি সহায়তা চাইতে না গেলে প্রতারণার বিষয়টি কখন কর্তৃপক্ষের নজরে আসত, তা বলা কঠিন।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ সব অভিবাসীর জন্য ঘটনাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও কাউকে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য, সরকারি পরিচয়সংক্রান্ত নম্বর, ব্যাংক হিসাব বা গুরুত্বপূর্ণ নথি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ এসব তথ্যের অপব্যবহার হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অজান্তেই প্রতারণার শিকার হতে পারেন, এমনকি আইনি জটিলতায়ও পড়তে পারেন।
তথ্যসূত্র: The Independent, LBC, PA Media







