ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রযুক্তির পাঠ, ঢাকায় ল্যাব: ‘কুশ’ চাষের আমেরিকান মাস্টারমাইন্ড তৌসিফ গ্রেফতার

ঢাকা, ০২ নভেম্বর – বাইরের আলো-বাতাস ঢোকার কোনো উপায় নেই, কিন্তু ঘরের ভেতরেই তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম পরিবেশ। ড্রয়িং রুম আর ছাদের ওপর বিশেষ শেড বানিয়ে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ফলানো হতো অতিমূল্যবান অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ (Kush)। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো— দেশে বানানো এই হাই-টেক মাদক ল্যাবের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও লাইটিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হতো সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে, দূরনিয়ন্ত্রিত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে!
অবশেষে পুরান ঢাকার ওয়ারীর সেই বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ইনডোর ‘কুশ ল্যাব’ পরিচালনাকারী মূল হোতা আমেরিকান নাগরিক তৌসিফ হাসানকে (২২) গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি), বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়, ঢাকা।
রোববার (১ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়ারী থানাধীন র্যাংকিন স্ট্রিটে তৌসিফের নিজ বাসায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে ডিএনসির একটি বিশেষ টিম।
কুরিয়ারের ইয়াবা পাচারের সূত্র ধরে ধরা পড়ে ‘হিডেন ল্যাব’
এই সিনেমার মতো ঘটনার জট খুলতে শুরু করে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবার একটি চালান পাঠানোর অপচেষ্টা চালায় এক চক্র। সেই ঘটনার অনুসন্ধানে নেমে ডিএনসির গোয়েন্দারা পৌঁছান ওয়ারীর র্যাংকিন স্ট্রিটের ওই ভবনে।
তৌসিফের বাসায় ডিএনসি টিম অভিযান চালাতেই বেরিয়ে আসে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য। বাসার ভেতরের কক্ষ ও ছাদের অংশজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এক আন্তর্জাতিক মানের মাদক চাষ কেন্দ্র।
সংগৃহীত আলামত: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে চোরাইপথে আনা উন্নত কুশের বীজ, টবে চাষ করা সতেজ কুশ গাছ, সদ্য সংগ্রহ করা কুশ, ইনডোর ফার্মিংয়ের হাই-টেক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, সিসা সেবনের নানা সরঞ্জাম ও বিদেশি মদ।
ছাদের ফয়েল পেপার রুম: বাসার ছাদে টিন ও বিশেষ তাপ-নিরোধক ফয়েল পেপার দিয়ে কৃত্রিম তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কক্ষ বানিয়ে সেখানেও একাধিক টবে গোপনে কুশের আবাদ করা হচ্ছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার ট্রেনিং ও বিদেশে বসে রিমোট কন্ট্রোল!
ডিএনসির অনুসন্ধান জানাচ্ছে, তৌসিফ যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় ক্যালিফোর্নিয়ায় কুশ চাষের কৌশল ও আধুনিক ইনডোর ফার্মিংয়ের প্রযুক্তি রপ্ত করেন। পরে দেশে ফিরে নিজের বাসাতেই ল্যাব গড়ে তোলেন।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতেন, তখনও দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির (Remote Control System) মাধ্যমে ঢাকায় থাকা এই ল্যাবের আবহাওয়া নিয়মিত মনিটর ও নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ কাজে দেশে তাকে সহায়তা করতেন তার এক বান্ধবী ও বাসার কেয়ারটেকার। ইতিপূর্বে এই বান্ধবীর নাম ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেই কুরিয়ারে ৩২ পিস ইয়াবা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়, যা ডিএনসির হাতে ধরা পড়েছিল।
পলাতক আসামি তৌসিফকে এবার রিমান্ডে নেওয়ার তোড়জোড়
টঙ্গী পশ্চিম থানায় দায়ের করা আগের মামলায় তৌসিফের ওই বান্ধবী ও বাসার কেয়ারটেকার গ্রেফতার হলেও মূল নকশাকার তৌসিফ এতদিন পলাতক ছিলেন। রোববারের এই অভিযানে তার হেফাজত থেকে নতুন করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাসাবাদে তৌসিফ স্বীকার করেছে যে, সে তার ল্যাবে উৎপাদিত বিরল ‘কুশ’ এবং সংগ্রহ করা ইয়াবা ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারিদের কাছে সরবরাহ করত।
ডিএনসি জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত মাদকের ঘটনায় তৌসিফের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ওয়ারী থানায় একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইসঙ্গে পূর্বের সেই আলোচিত ইনডোর কুশ ল্যাবের মামলাতেও তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করার প্রক্রিয়া চলছে।
এনএন/ ০২ নভেম্বর ২০২৬







