১ নভেম্বর থেকে খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করছে সরকার

ঢাকা,৩০ অক্টোবর-খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত খাদ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন বিধিমালায় শিশু, প্রবীণ এবং নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাস্তার পাশের খাবারের দোকান ও ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমদানিকারকদেরও নতুন বিধানের আওতায় আসতে হবে।
একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। এর ফলে ভোক্তারা সহজেই খাদ্যের উৎস শনাক্ত করতে পারবেন এবং কোনো অনিয়ম হলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পাবেন।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ তৈরি করা হয়েছে। গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশিত এই প্রবিধানমালার আওতায় নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন এবং লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. শফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন ও লাইসেন্স ব্যবস্থা কার্যকর হলে অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ এবং ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক কাঠামো তৈরি হবে।
বিশেষ করে শিশুদের ফর্মুলা দুধ, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, স্বাস্থ্য সহায়ক খাদ্য এবং রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ পথ্যের মতো সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, মূলত খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়ানো, খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা এবং ব্যবসায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
চেয়ারম্যান বলেন, শুধু নিবন্ধন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এ জন্য আরও কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। নিবন্ধনের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায়ীদের একটি তালিকার আওতায় আনা গেলে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। একই সঙ্গে কোথায় কারা খাদ্য ব্যবসা করছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে খাদ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বা কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
নিবন্ধিত খাদ্য ব্যবসায়ীদের সরাসরি এবং ডিজিটাল—দুই পদ্ধতিতেই প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাদের নির্দিষ্ট স্থানে আমন্ত্রণ জানিয়ে অথবা বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষণের আয়োজন করে সচেতনতা বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ উপকরণ, ভিডিও ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
বর্তমানে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছেও স্মার্টফোন রয়েছে। তারা ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। এসব মাধ্যম কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাবার তৈরি ও পরিবেশন এবং সঠিকভাবে খাদ্য সংরক্ষণের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও হালনাগাদ তথ্য দেওয়া যাবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধন নিতে হবে। অন্যদিকে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের নির্ধারিত চার শ্রেণির ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব শ্রেণির মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ এ ধরনের খাদ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুল কাদের বাসসকে বলেন, শিশু ও প্রবীণদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ, শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ এবং প্রবীণদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে এসব পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
একইভাবে নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স নিতে হবে।
তবে শিশু ও প্রবীণদের জন্য তৈরি সব ধরনের খাদ্যপণ্য একইভাবে লাইসেন্সের আওতায় পড়বে, বিষয়টি এমন নয়। সংশ্লিষ্ট পণ্যের শ্রেণি ও বিধিমালায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হবে।
এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য এবং স্বাস্থ্য সহায়ক বা রোগের ঝুঁকি কমানোর দাবি-সংবলিত খাদ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্স নিতে হবে। এর ফলে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী, মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানিকারকদের নিবন্ধন নিতে হবে। রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজুসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি করেন এমন ব্যবসায়ীদেরও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নিবন্ধন করতে হবে।
পাশাপাশি পাইকারি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার, কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদন এবং খাদ্য সংযোজন দ্রব্যের সঙ্গে যুক্ত নির্ধারিত ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিবন্ধন বা লাইসেন্সের বিধান কার্যকর হবে।
বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাদ্যপণ্যের মোড়কে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। এর ফলে ভোক্তারা পণ্যের প্যাকেট দেখেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সম্পর্কে জানতে পারবেন। কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ থাকলে নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করেও অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকবে। তবে শুধু নিবন্ধন নম্বর থাকলেই কোনো পণ্য নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। পণ্যের মান, উপাদান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও সংরক্ষণব্যবস্থার যথাযথ নিয়ন্ত্রণও জরুরি।
বিএফএসএ জানিয়েছে, বিধিমালার তফসিল-১০ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে।
নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম ৫.১ এবং বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ ব্যবহার করতে হবে। প্রাথমিকভাবে কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে।
পর্যায়ক্রমে শতভাগ অনলাইনে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থাও চালু করার উদ্যোগ রয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করা হবে। বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি নির্ধারণ করা হবে প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ভিত্তিতে। ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ফি ১০ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। এরপর তা নবায়ন করতে হবে।
নির্ধারিত ক্ষেত্রে নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই আগামী ১ নভেম্বর নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে নিবন্ধন বা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে।
নতুন বিধান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিয়মিত পরিদর্শন, আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ওপর।
বিশেষ করে ছোট ও ভ্রাম্যমাণ খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিধিমালার শর্ত ও আবেদনপ্রক্রিয়া সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিসহ সব ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
বিএফএসএর প্রত্যাশা, নতুন নিবন্ধন ও লাইসেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে, উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও জোরদার হবে।
এস এম/ ৩০ অক্টোবর ২০২৬







