ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গোপন ঘাঁটি নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে হামলার আশঙ্কা

ওয়াশিংটন, ৩০ অক্টোবর-ইরান কি বিদেশের মাটিতে মার্কিন নাগরিকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, নাকি নিজেদের ভূখণ্ডে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে? তেহরানের হাতে আসলে কী কী শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তাহলেই বোঝা যাবে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কী ঘটছে।
ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক মার্কিন কূটনীতিক সপরিবারে দ্রুত অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। সন্তানদের জন্য নতুন স্কুলের ব্যবস্থাও করেছিলেন তাঁরা। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর তাঁদের অনেকে আবার কর্মস্থলে ফিরে যান। কিন্তু এখন আবার তাঁদের চলে যেতে বলা হচ্ছে। কী ঘটেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এতটা সতর্ক অবস্থানে চলে গেল? মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করার তৎপরতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে’ ইরান। ইরান যদি এমন হামলা চালায়, তাহলে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস ও মিশন থেকে নিজেদের কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি তাঁরা আবার নিজ নিজ দপ্তরে ফিরে কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু এখন তাঁদের আবার সরে যেতে বলা হয়েছে। একজন মার্কিন কূটনীতিক সিএনএনকে বলেছেন, ‘ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রমকে বিশৃঙ্খল বললেও আসলে পরিস্থিতির পুরোটা বোঝানো হয় না।’
এ বিষয়ে আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএসএ) মুখপাত্র নিকি গেমার বলেন, ‘এ বছরের শুরুর দিকে পরিবারগুলো যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, এবারও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ফিরে এসে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার পরপরই আবার চলে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা হতাশ, বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।’
গত ২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর একটি নির্দেশ জারি করে। এতে সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের জরুরি নয়, এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আগ্রাসনের জবাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা চললেও পরিস্থিতি তখনকার মতো তীব্র নয়। তারপরও কেন ওয়াশিংটন তড়িঘড়ি করে দূতাবাস ও মিশন থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বারবার সতর্ক করে বলেছে, ‘এসব সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তবে শুধু সৌদি আরব নয়, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননে অবস্থিত দূতাবাস ও মিশন থেকেও নীরবে কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এএফপি, সিএনএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।
কেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার উত্তর পাওয়া যায় দুই দিন পর। ২৩ অক্টোবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্র দপ্তরে একটি স্মারক পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এ নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের ভেতরে একধরনের চাপা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জে ক্লেটনের পাঠানো ওই ‘অগোপনীয়’ স্মারকের অনুলিপি অ্যাক্সিওসসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের হাতে রয়েছে। স্মারকে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করার তৎপরতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে’ ইরান। এমনকি প্রাণঘাতী হামলার কিছু পরিকল্পনা ‘প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।
অ্যাক্সিওস জানায়, ২৩ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে স্মারকটি পাঠান জে ক্লেটন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি ইরানের হুমকি এখন ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এমন উচ্চমাত্রার হুমকি আর দেখা যায়নি।
কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, এই গোয়েন্দা তথ্যের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি মার্কিন দূতাবাস ও মিশনে কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে।
ক্লেটনের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। জবাবে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নতুন করে হামলা হলে এবার তাদের পাল্টা জবাব আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে।
ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ২১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। এ ছাড়া ৭৫০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের বলা পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেহরান সত্যিই পদক্ষেপ নিলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, অন্যান্য দেশেও মার্কিন নাগরিকেরা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।
স্মারকে থাকা গোয়েন্দা তথ্য কতটা উদ্বেগজনক?
বিদেশের মাটিতে মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ওই স্মারকে সতর্ক করা হয়েছে। স্মারকটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। এতে নাম প্রকাশ না করা মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইরান ইউরোপেও সম্ভাব্য কিছু লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস আরও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি ইরানের হুমকি এখন ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এমন উচ্চমাত্রার হুমকি আর দেখা যায়নি। এমনকি কিছু গোয়েন্দা তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ইরানি এজেন্টরা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্মারকটি নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। নিউইয়র্ক টাইমসকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হুতিদের হামলার হুমকি এবং ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা’—এই দুই কারণে বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে কর্মীর সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও অন্যান্য দেশে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা ইরানের সীমিত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের হাতে যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোর সবগুলো বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা দেশটির নেই।
তাহলে কি সত্যিই ইরানের সেই সক্ষমতা নেই? যদি না থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন এত দ্রুত কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে?
ক্ষেপণাস্ত্রই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি
ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময়। দেশটির হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ—দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে।
ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। অর্থাৎ এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় হামলা চালানো সম্ভব। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ইরানের স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ফাতেহ, জলফাগর, কিয়াম-১ এবং শাহাব-১ ও শাহাব-২। এগুলোর পাল্লা প্রায় ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত হামলা চালাতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, এমাদ, গাদর-১, খোররামশাহ ও সেজিল। নতুন নকশার খাইবার শেকান ও হজ কাসেমও রয়েছে এ তালিকায়। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার।
সেজিল ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, এটি কঠিন জ্বালানি বা সলিড ফুয়েল ব্যবহার করে। ফলে তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেজিলের পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার, এমাদের ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার, গাদরের ২ হাজার কিলোমিটার, শাহাব-৩-এর ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার এবং খোররামশাহরের ২ হাজার কিলোমিটার।
ইরান নিয়মিত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো, গত ২০ মার্চ ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার চেষ্টা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান ওই দ্বীপ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এর একটি মাঝপথেই ভেঙে পড়ে। অন্যটিকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ইরান ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
দিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই দূরত্ব ইরানের ঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লার প্রায় দ্বিগুণ।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কি ইউরোপে আঘাত হানতে পারবে?
দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার চেষ্টা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ইরান এত দিন বলে আসছে, তারা নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। কিন্তু ইসরায়েল বারবার দাবি করেছে, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
এমনটি হলে ইউরোপের বড় একটি অংশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় চলে আসতে পারে। অর্থাৎ লন্ডন বা প্যারিসের মতো বড় ও জনবহুল শহরেও হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পেরেছিল। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইরান ঘোষিত সীমার চেয়ে বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কাজ করছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইরানের খোররামশাহ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণ দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি। তবে হালকা ওয়ারহেড ব্যবহার করলে এর পাল্লা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বড় অস্ত্র ড্রোনও
ইরানের সামরিক সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ড্রোন। দেশটির ড্রোনভান্ডার বড় এবং বৈচিত্র্যময়। একমুখী হামলা, নজরদারি ও বিভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহারের জন্য তাদের হাতে নানা ধরনের ড্রোন রয়েছে।
ইরানের ড্রোন কর্মসূচির শুরু ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। প্রচলিত যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ড্রোনকে অসম যুদ্ধকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে ইরান।
দেশটির তিনটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বড় সামরিক ড্রোন তৈরি করে। শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করে শাহেদ সিরিজের ড্রোন। ইরান এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ বা হেসা তৈরি করে আবাবিল সিরিজের ড্রোন। আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিষ্ঠান কুদস এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করে মোহাজের সিরিজের ড্রোন।
ইরানের অনেক ড্রোন তাদের মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর কাছেও পৌঁছেছে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোন রাশিয়া গেরান-২ নামে ব্যবহার করে। হুতিরাও এটি ওয়াইদ-২ নামে ব্যবহার করে।
ইরানের একমুখী হামলার ড্রোনগুলোর অনেকগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে ওড়ানো হয়। এগুলো বিস্ফোরক বহন করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পর ধ্বংস হয়ে যায়।
ড্রোনের গতি কম হলেও এর বড় সুবিধা হলো, এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং একসঙ্গে অনেকগুলো পাঠানো যায়। ফলে একের পর এক ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলা সম্ভব।
ইরানের ড্রোনভান্ডারে শাহেদ-১০১, শাহেদ-১২৯, শাহেদ-১৪৯, শাহেদ-১৭১, আরাশ-২, আবাবিল এবং মোহাজের সিরিজের বিভিন্ন ড্রোন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ড্রোন নজরদারির কাজে, কিছু হামলার কাজে এবং কিছু দুই ধরনের কাজেই ব্যবহার করা যায়।
ভূগর্ভে লুকানো ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি
যুদ্ধের সময় শুধু কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং কত দিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটিও বড় বিষয়। ইরান কয়েক বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কিছু অংশ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, গোপন ঘাঁটি ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্রে রেখেছে।
দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত পাঁচটি ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে। এর মধ্যে কেরমানশাহ ও সেমনানও আছে। এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একবারে ধ্বংস করে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, উৎপাদন ও সংরক্ষণের অবকাঠামোও ভূগর্ভে তৈরি করা হয়েছে। ২০২০ সালে ইরান প্রথমবার ভূগর্ভ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানায়।
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা পরিবর্তন, বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং হালকা উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্লা বাড়ানোর কাজও করে আসছে ইরান।
২০২৩ সালে নিজেদের তৈরি প্রথম ‘হাইপারসনিক’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনের কথা জানায় ইরান। দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেপণাস্ত্রের গতি শব্দের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ হতে পারে। তবে এসব অস্ত্রের কার্যকর সক্ষমতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।
উপসাগরের যোগাযোগব্যবস্থাও হতে পারে লক্ষ্যবস্তু
ইরানের হুমকি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের তার বা কেবল লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনাও করেছে তেহরান।
দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নতুন করে হামলা হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের তারগুলো লক্ষ্য করে হামলার বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে ইরান। তাঁদের একজন বলেছেন, হামলার পর যেন দ্রুত এসব তার মেরামত করা না যায়, সেই ব্যবস্থাও নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এতে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিভাগের উপপ্রধান ইয়াদউল্লাহ জাভানি বলেছেন, ইরানের অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালির নিচে থাকা সাতটি বড় ইন্টারনেট কেবল লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান আবার আক্রান্ত হলে পাল্টা হামলার ‘কোনো সীমারেখা থাকবে না’। যোগাযোগের ভূগর্ভস্থ তার থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত সবকিছুই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে চাপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ঝুঁকি
সমুদ্রপথেও চাপ তৈরির বিভিন্ন উপায় রয়েছে ইরানের হাতে। উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে এই এলাকায় সামান্য অস্থিরতাও বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে পাল্টা জবাব দিতে তারা নতুন ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশল গ্রহণ করবে। বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, এবার ইরান শুধু পাল্টা হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মান, পাল্লা ও শক্তি বেড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের আশঙ্কার কথা বলেছেন। গত ২৬ অক্টোবর মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাঁর দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরেও হামলা চালানো সম্ভব।
আগেই বলা হয়েছে, ইরানের হাতে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নানা ধরনের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি এবং সমুদ্রপথে চাপ তৈরির সক্ষমতাও দেশটির সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামোয় হামলার পরিকল্পনাও যুক্ত হতে পারে।
হয়তো ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনা, সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা, কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবার এবং মিত্রদেশগুলোর অবকাঠামো ইরানের অস্ত্রের আওতার মধ্যে রয়েছে। ইউরোপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে পারার আশঙ্কাও বাড়ছে।
তাই নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের এসব সামরিক সক্ষমতাই ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এস এম/ ৩০ অক্টোবর ২০২৬







