
গল্পটি আসলে একটি সানগ্লাসের গল্প নয়। এর মধ্যে আছে হলিউডের গ্ল্যামার, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, ফ্যাশনের উত্থান এবং এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন অধ্যায়। যে চশমার জন্ম হয়েছিল আকাশে সূর্যের তীব্র আলো থেকে পাইলটের চোখ রক্ষা করতে, প্রায় নব্বই বছর পর সেই চশমাই ছবি তুলছে, ভিডিও করছে, গান শোনাচ্ছে, কথা শুনছে, মোবাইল ফোনের মতো হ্যান্ডস-ফ্রি কথোপকথনের সুযোগ দিচ্ছে, ভাষা অনুবাদ করছে, এমনকি চোখের সামনে থাকা কোনো বস্তু বা স্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে উত্তরও দিচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে বদলেছে পৃথিবী, বদলেছে ফ্যাশন, বদলেছে প্রযুক্তি। কিন্তু নামটি রয়ে গেছে একই, Ray-Ban।
এর শিকড় খুঁজতে হলে যেতে হবে ১৮৫৩ সালে। নিউইয়র্কের রচেস্টারে জার্মান অভিবাসী জন জ্যাকব বাউশ ছোট একটি অপটিক্যাল সামগ্রীর দোকান খুলেছিলেন। ব্যবসা বড় করতে বন্ধু হেনরি লম্বের কাছ থেকে ধার নেন ৬০ ডলার। পরে লম্ব তাঁর অংশীদার হন, আর দুই বন্ধুর নাম মিলিয়েই জন্ম নেয় Bausch & Lomb। সেই ছোট উদ্যোগই একদিন হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত অপটিক্যাল প্রতিষ্ঠান।
শুরুর দিনগুলোতে তারা চশমার ফ্রেম ও বিভিন্ন অপটিক্যাল যন্ত্র তৈরি করত। তখন চশমার ফ্রেম অনেক ক্ষেত্রেই দামি উপকরণ দিয়ে তৈরি হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক প্রয়োজনেও তারা বিশেষ ধরনের চোখ রক্ষাকারী সরঞ্জাম তৈরি করেছিল। এরপর আসে উড়োজাহাজের যুগ।
পাইলটদের চোখকে তীব্র আলো ও ঝলকানি থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ধরনের লেন্সের প্রয়োজন দেখা দিল। Bausch & Lomb দীর্ঘ গবেষণার পর এমন লেন্স তৈরি করল, যা তীব্র আলো কমিয়েও দৃষ্টি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করত। ১৯৩৭ সালে বাজারে এলো সেই বিখ্যাত Aviator। প্রথমে মার্কিন বৈমানিকদের জন্য তৈরি হলেও ধীরে ধীরে এই চশমাই হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে অভিজাত ও ফ্যাশনেবল সানগ্লাস নকশাগুলোর একটি।
Ray-Ban নামটির মধ্যেও রয়েছে মজার ইঙ্গিত। ‘Ray’ মানে আলোকরশ্মি আর ‘Ban’ মানে বাধা দেওয়া। অর্থাৎ যে চশমার কাজ সূর্যের বিরক্তিকর রশ্মি ঠেকানো, তার নামই হয়ে গেল Ray-Ban। কাজের প্রয়োজন থেকে তৈরি এই নামটিই সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠল ফ্যাশনের ভাষা। আজ Ray-Ban বললে শুধু সূর্য থেকে চোখ রক্ষার কথা মনে পড়ে না, সঙ্গে চলে আসে আভিজাত্য, ব্যক্তিত্ব এবং খানিকটা রহস্যময়তার ছবিও।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো, কিন্তু পাইলটদের ঘিরে তৈরি হওয়া রোমাঞ্চ শেষ হলো না। লেদার জ্যাকেট আর Aviator চশমা যুদ্ধের মাঠ ও বিমানঘাঁটি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠতে শুরু করল। যাঁরা কোনো দিন যুদ্ধবিমানের ককপিটে বসেননি, তাঁরাও চোখে Aviator তুলে একটু পাইলটসুলভ চেহারা পেতে চাইলেন। Ray-Ban তখন বুঝতে শুরু করল, চোখ রক্ষার চেয়েও বড় একটি বাজার সামনে খুলছে। এরপর চশমাটি পৌঁছাল এমন এক জায়গায়, যেখানে জনপ্রিয় কোনো অভিনেতার চোখে কয়েক সেকেন্ডের উপস্থিতিও হাজার বিজ্ঞাপনের চেয়ে বেশি কাজ করতে পারে। সেই জায়গাটির নাম হলিউড।
১৯৫২ সালে Ray-Ban নিয়ে এলো Wayfarer। Aviator-এর পাতলা ফ্রেমের সঙ্গে এর প্রায় কোনো মিলই ছিল না। মোটা ফ্রেম, দৃঢ় রেখা এবং চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি। এটি ছিল এমন এক নকশা, যাকে লুকিয়ে পরার উপায় নেই। ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে Wayfarer নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ও সাধারণ মানুষের চোখে জায়গা করে নিতে নিতে এটি ধীরে ধীরে একটি চশমার চেয়ে বেশি কিছু, ফ্যাশনের একটি পরিচিত প্রতীক হয়ে ওঠে।
মানুষ চশমা কেনে মূলত চোখ রক্ষার জন্য, কিন্তু Ray-Ban কিনতে শুরু করল ব্যক্তিত্ব দেখানোর জন্যও। Aviator-এর মধ্যে ছিল পাইলটের সাহস ও দুঃসাহসিকতার ছাপ, Wayfarer-এর সঙ্গে জুড়ে গেল তারুণ্য ও বিদ্রোহ, আর Clubmaster নিয়ে এলো একটু বুদ্ধিদীপ্ত, একটু পুরোনো দিনের আভিজাত্য। তিনটি আলাদা নকশা তিন ধরনের মানুষের মুখে তিন রকম গল্প বলতে শুরু করল। চশমার ফ্রেম তখন আর শুধু চোখে পরার একটি বস্তু হয়ে থাকল না, মানুষের চরিত্র প্রকাশেরও একটি ভাষা হয়ে উঠল।
সিনেমা ও সংগীত সেই ভাষাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পর্দায় কখনো পুলিশ কর্মকর্তার চোখে, কখনো পাইলটের চোখে, কখনো রহস্যময় নায়ক কিংবা সংগীত তারকার চোখে Ray-Ban দেখা গেছে। চশমার একটি সুবিধা হলো, এটি কোনো সংলাপ ছাড়াই চরিত্র সম্পর্কে দর্শককে ইঙ্গিত দিতে পারে। চোখ ঢাকা থাকায় মানুষের মুখে খানিকটা রহস্য আসে, Aviator দিলে সাহসী ভাব, Wayfarer দিলে অন্যরকম ব্যক্তিত্ব। এভাবেই Ray-Ban চলচ্চিত্রের কস্টিউম থেকে ধীরে ধীরে চরিত্রের অংশ হয়ে যায়।
ফ্যাশনের দুনিয়ায় কোনো আইটেমের দীর্ঘ জীবন পাওয়া সহজ নয়। আজ যে নকশা নিয়ে মাতামাতি, কয়েক বছর পর সেটিই পুরোনো বলে আলমারিতে চলে যেতে পারে। Ray-Ban এই নিয়মের ব্যতিক্রমগুলোর একটি। ১৯৩৭ সালের Aviator প্রায় নব্বই বছর পরও বিক্রি হচ্ছে, ১৯৫২ সালের Wayfarer-ও সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের মুখে ফিরছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় Ray-Ban সময়ের সঙ্গে নতুন নকশাও এনেছে। Headliner সেই ধারার একটি পরিচিত নাম, যা এখন Ray-Ban Meta AI glasses-এরও অন্যতম ফ্রেম। আর ২০২৬ সালে এসেছে Scriber Optics, বিশেষ করে প্রেসক্রিপশন চশমা ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি আরও সরু ও আরামদায়ক একটি নকশা।
আজ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে Meta-র সঙ্গে অংশীদারত্বে Ray-Ban এমন চশমা তৈরি করেছে, যা বাইরে থেকে দেখলে পরিচিত সেই Ray-Ban, কিন্তু ফ্রেমের ভেতরে ঢুকে গেছে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, স্পিকার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই চশমা দিয়ে ছবি ও ভিডিও তোলা যায়, হ্যান্ডস-ফ্রি ফোনে কথা বলা যায়, গান শোনা যায়, প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায় এবং প্রয়োজন হলে ভাষা অনুবাদেও সাহায্য নেওয়া যায়। সামনে থাকা কোনো স্থাপনা, বস্তু বা দৃশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সে সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া সম্ভব।
ফ্যাশনের ইতিহাসে অনেক ব্র্যান্ড এসেছে, অনেক ব্র্যান্ড হারিয়েও গেছে। Ray-Ban টিকে আছে সম্ভবত একটি কারণেই। সময় বদলেছে, মানুষের পোশাক বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু Ray-Ban নিজের পরিচিত চেহারাটি পুরোপুরি বদলায়নি। বদলেছে সেই পরিচিত মুখের ভেতরের গল্প।
তথ্যসূত্র: Ray-Ban; Meta Newsroom







