
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশের গুরুত্ব শুধু তার আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা সামরিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থার জায়গা তৈরি করার মধ্যেও রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। কানাডা তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় আরও বিস্তৃত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, কানাডার সঙ্গে সম্পর্ককে তাঁরা প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নিয়ে যেতে আগ্রহী। পরিবর্তনশীল বিশ্বরাজনীতিতে ইউরোপের কাছে কানাডার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বই এই উদ্যোগের প্রধান তাৎপর্য।
আগামী ২৯ ও ৩০ অক্টোবর মন্ট্রিয়লে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেবেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা। সম্মেলনের লক্ষ্য দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও গভীর করা। ইউরোপীয় কমিশন কানাডাকে ‘সহযোগী সদস্য’ হিসেবে বিবেচনার ধারণা সামনে এনেছে। তবে কয়েকটি সদস্যদেশ এই মর্যাদার আইনি পরিধি ও আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা স্পষ্ট করার পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে অংশীদারত্বের কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন মূলত ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হলেও কানাডার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমার বাইরে গিয়ে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থা, অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ। কানাডার প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নত প্রযুক্তি, স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা ইউরোপের কাছে দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ গ্রহণ কানাডার লক্ষ্য নয়। অটোয়া এমন একটি সম্পর্ক চায়, যেখানে নিজস্ব আইন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রেখেই ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্ভব হবে। নতুন অংশীদারত্ব সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
দুই পক্ষের সম্পর্কের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৫৯ সালে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা শুরু হয়। ২০১৭ সালে সমন্বিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি সিইটিএ আংশিকভাবে কার্যকর হওয়ার পর সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। কানাডা সরকারের হিসাবে, ২০২৫ সালে দুই পক্ষের পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৮৬০ কোটি কানাডীয় ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। উভয় পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগও রয়েছে।
এবার ডিজিটাল বাণিজ্য, নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান, অনলাইন লেনদেন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা চলছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজসম্পদের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কানাডার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের বিস্তৃত বাজার কানাডীয় পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে দুই পক্ষ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫ হাজার কোটি ইউরোর প্রতিরক্ষা কর্মসূচি ‘সেফ’-এ যোগ দেওয়া প্রথম অ-ইউরোপীয় দেশ হয়। এর আওতায় মন্ট্রিয়লভিত্তিক মার্কনি টেকনোলজিস পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর জন্য উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি পেয়েছে। এতে কানাডার প্রতিরক্ষাশিল্পের জন্য ইউরোপীয় বাজারে বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপের সুপারকম্পিউটার অবকাঠামো কানাডীয় গবেষকদের ব্যবহারের সুযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে সহযোগিতা এবং গ্যালিলিওসহ নিরাপদ উপগ্রহ যোগাযোগব্যবস্থায় অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে। পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থা সুরক্ষা, বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ ও সাইবার নিরাপত্তায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আসন্ন মন্ট্রিয়লের শীর্ষ সম্মেলন কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এই উদ্যোগের রাজনৈতিক বার্তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার প্রচলিত সদস্যপদ কাঠামোর বাইরে গিয়ে কানাডার জন্য বিশেষ অংশীদারত্বের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কানাডার গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail
Office of the Prime Minister of Canada
European Council: Canada-EU Summit 2026







