সম্পাদকের পাতা

মিশিগানের হামট্র্যামকের প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান মেয়র হওয়ার পথে মুহিত মাহমুদ

নজরুল মিন্টো

মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়রের দায়িত্বও নিয়েছেন। তবু হাল ছাড়েননি। ভোটের হিসাব থেকে বাদ পড়া ৩৭টি ব্যালট গণনার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। প্রায় এক বছর পর সেই ভোট গণনা হতেই পাল্টে গেল হিসাব। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হামট্র্যামক শহরের মেয়র নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান এই প্রার্থী এখন এগিয়ে ১২ ভোটে। তবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাঁকে পেরোতে হবে আরও একটি আইনি বাধা।

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ডেট্রয়েটে ওয়েন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্সের তত্ত্বাবধানে আগে গণনা না হওয়া বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট গণনা করা হয়। এর মধ্যে মেয়র প্রার্থী মুহিত মাহমুদ পান ২৯ ভোট এবং বর্তমান মেয়র আদম আলহারবি পান ছয় ভোট। নতুন হিসাবে মাহমুদের মোট ভোট দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৯। আলহারবির ভোট ২ হাজার ৭৭। তবে এই ফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা হয়নি।

মাহমুদের হামট্র্যামকে বসবাস এবং মেয়র পদে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নিয়ে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ওয়েন কাউন্টির আইনজীবী রেবেকা কামারগো জানিয়েছেন, ওই মামলার শুনানির আগে মাহমুদকে বিজয়ী হিসেবে প্রত্যয়ন করতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে ২২ অক্টোবর। ফলে ভোটে এগিয়ে গেলেও ১৭ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাহমুদের মেয়র হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে পারলে হামট্র্যামকের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান মেয়র হবেন মুহিত মাহমুদ। ডেট্রয়েটের গণমাধ্যম ডব্লিউডিইটি নির্বাচনের আগেই তাঁর প্রার্থিতার এই ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেছিল। সিলেটের গোলাপগঞ্জের সন্তান মাহমুদের রাজনৈতিক পথচলায় তাই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে দীর্ঘদিন বাদ পড়ে থাকা ভোটগুলো।

ঘটনার শুরু ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে। মিশিগান আপিল আদালতের রায়ে উঠে এসেছে, ভোটের রাতে প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক হিসাবে আলহারবি পেয়েছিলেন ২ হাজার ৯ ভোট এবং মাহমুদ ১ হাজার ৯৯৮ ভোট। পরদিন নগর ক্লার্ক দেখতে পান, গণনার জন্য পাঠানো ব্যালটের খামের সংখ্যা ও গণনা করা ভোটের সংখ্যায় ৩৭টির ব্যবধান রয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ৩৭টি খাম খোলা হলেও ভেতরের ব্যালট বের করে গণনা করা হয়নি। সেগুলো গণনা হয়ে যাওয়া ব্যালটের খামগুলোর সঙ্গে মিশে ছিল।

পরে ব্যালটগুলো নিরাপদ পাত্রে রেখে সিলগালা করে কাউন্টি বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু এর আগে নগর ক্লার্কের কার্যালয়ে অনুমোদিত নির্বাচনী কর্মীদের বাইরেও কয়েকজন প্রবেশ করেছিলেন বলে জানা যায়। এতে ব্যালটগুলোর হেফাজত ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেগুলো গণনা করার বিষয়ে বোর্ডে মতৈক্য না হওয়ায় প্রত্যয়িত ফলাফলে ওই ভোট অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

নির্বাচনের প্রাথমিক প্রত্যয়িত ফলে আলহারবি এগিয়ে ছিলেন ছয় ভোটে। পরে পুনর্গণনায় তাঁর ভোট বেড়ে হয় ২ হাজার ৭১, মাহমুদের ভোট থাকে ২ হাজার ৬০। ব্যবধান দাঁড়ায় ১১ ভোটে। আলহারবি জানুয়ারিতে মেয়রের দায়িত্ব নিলেও বাদ পড়া ৩৭টি ব্যালট গণনার জন্য মাহমুদের আইনি লড়াই চলতে থাকে।

নিম্ন আদালতে প্রতিকার না পেয়ে মাহমুদ আপিল করেন। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ মিশিগান আপিল আদালত নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত উল্টে দেয় এবং আইন অনুযায়ী ব্যালটগুলো যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের রায়ে বলা হয়, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ম পালনের ব্যর্থতার কারণে যোগ্য ভোটারের ভোট গণনার বাইরে রাখা যায় না, যদি অন্য কোনো আইনি কারণে সেটি অযোগ্য না হয়। আগস্টে মিশিগান সুপ্রিম কোর্ট আপিল শুনতে অস্বীকৃতি জানালে ওই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। এরপর নিম্ন আদালতের প্রক্রিয়া পেরিয়ে শুক্রবার ভোটগুলো গণনা করা হয়।

নতুন হিসাব ঘোষণার পর গণনাস্থলে মাহমুদের সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। মাহমুদ বোর্ডকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁর লড়াইয়ের বিষয় শুধু জয় নয়, গণতন্ত্র ও ভোটারের অধিকার। শহরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে আলহারবিকেও একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে আলহারবি পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ব্যালটগুলোর নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি তুলে ফল চ্যালেঞ্জ করার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর আইনজীবী নাবিহ এইচ. আয়াদও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে তাঁদের তোলা কারচুপির অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগের পাশাপাশি মাহমুদের বসবাসসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তিও বাকি রয়েছে।

আলহারবির দাবি, মাহমুদ প্রকৃতপক্ষে হামট্র্যামকের বাসিন্দা নন, থাকেন ট্রয় শহরে। মাহমুদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ডব্লিউডিইটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ২০২১ সালে কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় থেকে হামট্র্যামকে বসবাস করছেন। ট্রয়ে তাঁর আরেকটি বাড়ি রয়েছে, যেখানে পরিবারের সদস্যরা থাকেন।

মাহমুদের জনসম্পৃক্ততার ইতিহাস অবশ্য এই নির্বাচনকে ছাড়িয়ে বিস্তৃত। তিনি আতিথেয়তা খাতের কর্মীদের সংগঠন ইউনাইট হিয়ার লোকাল ২৪-এ নেতৃত্ব দিয়েছেন। মিশিগান বাংলাদেশি-আমেরিকান ডেমোক্রেটিক ককাসের সভাপতি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির স্থানীয় সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করেছেন। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে সহায়তামূলক কাজ করা গোলাপগঞ্জ হেল্পিং হ্যান্ড ইউএসএর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ২০২২ সালে কাউন্সিল সদস্য আদম আলবারমাকি পদত্যাগ করলে শূন্য পদে মাহমুদ নিযুক্ত হন।

প্রায় এক বছর আগে ১১ ভোটে পিছিয়ে থাকা মুহিত মাহমুদ এখন ১২ ভোটে এগিয়ে। ভোটের অঙ্ক তাঁর পক্ষে ঘুরেছে। এখন অপেক্ষা আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়নের। সেই পথ পেরোতে পারলেই হামট্র্যামকের মেয়রের আসনে প্রথমবারের মতো বসবেন একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান।

এনএন/ ১৭ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language