জাতীয়

পুলিশে রদবদল: গণঅভ্যুত্থান ও পলায়নকাণ্ডে ১৪৭ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে, বরখাস্ত ৩১

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর – জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শৃঙ্খলাভঙ্গ, পলায়ন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডসহ নানা সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদ পদক্ষেপ। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে শুরু করে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ জন কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে কর্মস্থল থেকে ‘পলায়নের’ অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে ৩১ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপন করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাকশন রিপোর্টের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ

সংসদীয় কমিটির পরামর্শ ও নির্দেশনার আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিতর্কিত ও পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আইনি পদক্ষেপের একটি স্পষ্ট খতিয়ান তুলে ধরে:

পলাতক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-কেন্দ্রিক ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক থাকায় ৫৭ জন এএসপি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিভাগীয় তদন্ত শেষে তাদের মধ্যে ২৮ জনকে চাকরিচ্যুত এবং ১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল ও ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার: গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ২৯ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে ডিআইজি (উপমহাপুলিশ পরিদর্শক) পদমর্যাদার ২ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠানো হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ড: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর ২০২৫ সালের চারটি মামলার রায়ের ভিত্তিতে ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দণ্ডিত ৫ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং ৮ জনের বিভাগীয় বিচার চলছে।

পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) পর্যায়ে ব্যবস্থা: গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধে ৫ জন পুলিশ পরিদর্শককে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে এবং **৭৩ জন পরিদর্শককে বাধ্যতামূলক অবসরে** পাঠানো হয়েছে। আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

বিতর্কিতদের পদায়ন নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে ক্ষোভ

বৈঠকে গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা বা গুম কমিশনের প্রতিবেদনে নাম থাকা কিছু কর্মকর্তা আবারও ঢাকা ও নরসিংদীর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্যরা।

এমপি শিরীন সুলতানা প্রশ্ন উত্থাপন করেন, বিতর্কিত ও সাজাপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা কীভাবে পুনরায় সংবেদনশীল থানায় পদায়ন পাচ্ছেন?

এমপি মনোয়ার হোসেন গুম কমিশনের তালিকায় নাম থাকা কর্মকর্তা ও সাজাপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

পুলিশের মনোবল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি

বৈঠকে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মব ও নানামুখী বাধা কাটিয়ে পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে এবং মনোবল ফেরাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুন, ডাকাতি, নারী নির্যাতন ও মাদকের মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির চিত্র দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

ভবিষ্যৎ রূপরেখা: সাইবার পুলিশ ও নতুন প্রযুক্তি

কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ এবং রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও জনগণের আস্থা

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীকে রাজনীতিমুক্তকরণ এবং বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে এই নজিরবিহীন আইনি ব্যবস্থা বাহিনীর শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাঠপর্যায়ে পুরোনো বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন পুরোপুরি বন্ধ না হলে এই সংস্কার উদ্যোগের পূর্ণ সুফল মিলবে না বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

এনএন/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language