ইউরোপ

বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের শিক্ষার্থীদের অফার লেটার বাতিল করছে যুক্তরাজ্যেের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

লন্ডন, ১২ অক্টোবর – যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির অফার লেটার (Offer Letter) পেয়েও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ফিকে হতে বসেছে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদন বাতিল এবং স্থগিতের নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মূলত স্টুডেন্ট ভিসা সংক্রান্ত হোম অফিসের (Home Office) কঠোর নীতির কারণে নিজেদের ‘স্পন্সরশিপ লাইসেন্স’ বাঁচাতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই আগাম ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

১০% থেকে কমে ৫%: লাইসেন্স হারানোর বড় ঝুঁকি

যুক্তরাজ্য সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের বেশি হলেই ওই প্রতিষ্ঠান বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির স্পন্সরশিপ যোগ্যতা হারাতে পারে। আগে এই সীমা ছিল ১০ শতাংশ।

“আগে ১০% পর্যন্ত ভিসা বাতিলের ছাড় থাকলেও বর্তমানে তা কমিয়ে মাত্র ৫% করা হয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল হলেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হয়ে যাবে।”

ভিসা প্রসেসিং সংক্রান্ত ডেটা এনালিটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘এনরোলি’ (Enrollee)-র উপাত্ত অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে মূল ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিসা আবেদনের আগেই শিক্ষার্থীদের অফার লেটার বা ভর্তি বাতিল করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান: আবেদন বাতিলের হার আকাশচুম্বী

ব্রিটিশ হোম অফিসের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে যুক্তরাজ্যে পড়ালেখার উদ্দেশ্যে করা মোট ভিসা আবেদনের ১০.৫ শতাংশই বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর আগের বছরগুলোতে এই হার ছিল অত্যন্ত কম—গত বছরের একই সময়ে ছিল ২.৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ।

| দেশ | আগের বছর (আবেদন বাতিলের হার) | ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ (আবেদন বাতিলের হার) |

  • বাংলাদেশ | ৭.১% | ২৩.৫% |
  • পাকিস্তান | ৩.০% | ৪০.৯% |
  • ভারত | ১.২% | ৫.২% |

হোম অফিসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকরা স্টুডেন্ট ভিসাকে রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) প্রার্থনা বা স্থায়ী বসবাসের ‘ব্যাকডোর’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এমন সন্দেহের জেরেই এই দেশগুলোর ভিসা বাতিলের হার প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতে নেমে আসছে আর্থিক সংকট

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের যুগে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাই ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজস্বের বড় অংশ জোগান দিয়ে থাকেন। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান মতে, ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যের অন্তত ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তান থেকে নতুন শিক্ষার্থী নেওয়া পুরোপুরি স্থগিত করেছে।

ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী ভানেসা উইলসন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হবে। এর ফলে আগামী দিনে স্টাফ ছাঁটাই, কোর্স বন্ধ করা এবং এমনকি ক্যাম্পাস গুটিয়ে নেওয়ার মতো চরম পথ বেছে নিতে হতে পারে।

হোম অফিসের এই অনমনীয় নীতি কেবল বাংলাদেশি বা এশীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেনি, বরং যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতের ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। অফার লেটার বাতিল হওয়ায় স্টাডি ভিসার জন্য আবেদন করার সুযোগটিই শুরুতেই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

এনএন/ ১২ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language