রাতে ধ্বংসস্তূপ, সকালে হাহাকার: ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫ শিশুসহ নিহত ২৮

কিয়েভ, ০৮ অক্টোবর – শীতের হাতছানি আর যুদ্ধের ঘোর অমানিশার মধ্যেই ইউক্রেনজুড়ে আবারও নেমে এলো বিভীষিকাময় রাত। ৭ অক্টোবর বুধবার গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত চেরনিহিভ প্রদেশসহ দেশটির বিভিন্ন জনপদে একযোগে ৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩০টিরও বেশি ঘাতক ড্রোন দিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছে রুশ বাহিনী।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ৭৪তম জন্মদিনের দিনে চালানো এই নজিরবিহীন হামলায় প্রিলুকি শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৮ জন সাধারণ নাগরিক, যার মধ্যে রয়েছে ৫টি নিষ্পাপ শিশু।
ঘুমন্ত শিশুদের ওপর আঘাত: প্রিলুকির নারকীয় দৃশ্যপট
উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ প্রদেশের প্রিলুকি জেলায় বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আঘাত হানে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র। পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে মুহূর্তের মধ্যে ভবনটির অর্ধেক অংশ ছাই ও ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হয়।
পাঁচ শিশুর করুণ মৃত্যু: নিহত শিশুদের মধ্যে তিনজনের বয়স ছিল মাত্র ১২ মাস (১ বছর) এবং একজনের বয়স ছিল আট বছর। উদ্ধারকাজের শেষ ভাগে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় আরও এক শিশুর নিথর দেহ।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা: প্রিলুকির বাসিন্দা ও ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ওলেনা সায়ুন (৪০) জানান, বিস্ফোরণের বিকট শব্দে তাঁদের ঘরের সব কাঁচ ভেঙে পড়ে। নিজেদের শরীর দিয়ে সন্তানকে আঁকড়ে ধরে তারা বাথরুমে আশ্রয় নেন। সামান্য আঘাত পেয়ে প্রাণে বাঁচলেও তাঁদের শিশু সন্তানটি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত বা ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’-এ ভুগছে।
কিয়েভে চরম আতঙ্ক: সাবওয়ে স্টেশনে নির্ঘুম রাত
হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ছিল ইউক্রেনের শক্তি বা জ্বালানি অবকাঠামো। শীতের আগে জনগণকে বিদ্যুৎ ও উত্তাপহীন করে ফেলে মনোবল ভেঙে দেওয়াই এই বিমান হামলার মূল কৌশল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে অবিরাম বেজে চলেছে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন। জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার আতঙ্কিত মানুষ কম্বল, শোয়ার মাদুর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে সাবওয়ে (মেট্রো) স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। ব্যাংক কর্মকর্তা ইরিনা রিবালচেঙ্কোর ভাষায়, “পুরো কিয়েভ শহর এখন তীব্র আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।”
জেলেনস্কির তোপ ও এয়ার ডিফেন্সের সংকট
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে গত পাঁচ বছরের সংঘাতের মধ্যে অন্যতম ‘ঘৃণ্য ও পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেসামরিক শহর ও শিশুদের লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালানো রাশিয়ার কোনো সামরিক সাফল্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরির একটি সুনির্দিষ্ট নীল নকশা।
জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেছেন, রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করা বর্তমানে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে নতুন ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না পেলে এ ধরনের প্রাণহানি ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: যুদ্ধের মোড় কোন দিকে?
পাঁচ বছর ধরে চলতে থাকা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর এমন নারকীয় হামলা প্রমাণ করে যে, রাশিয়া কূটনীতির পথ ছেড়ে পূর্ণমাত্রার সামরিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে চায়। অন্যদিকে, সামনেই কঠিন শীতকাল—জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে এই আঘাত অব্যাহত থাকলে ইউক্রেনজুড়ে মানবিক বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬







