২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, ৬০ শতাংশ নারী

ঢাকা, ১০ অক্টোবর-কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি নিশ্চিত করতে সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষ রাখা হয়েছে।
সম্ভাবনাময় কৃষি খাতকে এগিয়ে নেওয়া, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বা ডিএএম অংশের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার ২০৮টি উপজেলায় ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ প্রকল্পের আওতায় কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ, নার্সারি, মাশরুম, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন উপখাতে উদ্যোক্তা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের জন্য ভ্যালুচেইনভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোক্তার বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পাওয়া উদ্যোক্তাদের অন-দ্য-জব প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ইনকিউবেশন সহায়তার মাধ্যমে পাঁচটি কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি নিশ্চিত করার কাজ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চালের ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডি গঠন করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডির নীতিমালা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদিত হয়েছে।
প্রশিক্ষণ পাওয়া উদ্যোক্তাদের ম্যাচিং গ্র্যান্ট সহায়তা দেওয়া হবে। এ সহায়তার আওতায় বাড়িতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে। এসব যন্ত্রপাতি কেনার খরচের ৭০ শতাংশ প্রকল্প থেকে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি ৩০ শতাংশ খরচ উদ্যোক্তাদের নিজেদের বহন করতে হবে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পার্টনার-ডিএএম অংশের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, মাশরুম, নার্সারি, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত পণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৭ হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, সারাদেশের ৬৪ জেলা ও ২০৮টি উপজেলায় এ কার্যক্রম চলছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু উদ্যোক্তা তৈরি করা হচ্ছে না, পাশাপাশি তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান এবং বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর উদ্যোক্তাদের ইনকিউবেশন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করার উপায় নিয়ে ইনকিউবেশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
ডিএএমের আওতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় এ ধরনের ৭৬৭টি স্কুল গঠন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘যে এলাকায় যে পণ্যের উৎপাদন বেশি, সেখানে সেই পণ্যকে কেন্দ্র করে মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গড়ে তোলা হচ্ছে। আলুর ক্ষেত্রে ২২৭টি স্কুল করা হয়েছে। এ বছর আরও ৩৩৫টি স্কুল করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এসব স্কুলের মাধ্যমে কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগারের মালিক, পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং বাজারের অন্যান্য অংশীজনকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের পুরো বাজারব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা সহজ হবে।
উদ্যোক্তাদের দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির কান্ডারি উল্লেখ করে পার্টনার প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, উদ্যোক্তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হন না, বরং সমাজের আরও দশজনের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেন। বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদেরও নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে হবে এবং সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ কৃষিকে আধুনিক ও সম্মানজনক পেশায় পরিণত করতে সাহায্য করবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া উদ্যোক্তারা তাদের প্রাণচাঞ্চল্য, কর্মস্পৃহা ও জীবনীশক্তি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১২ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক দক্ষতা অর্জন করেছেন গাজীপুরের তামিমা আক্তার ন্যান্সি। জেলার সদর থানার পিরুজালী ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের ন্যান্সি পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শুরু করেন। এ কাজে সফলতা ও প্রশংসা পাওয়ার পর জ্যাম, জেলি, আচার, কাঁঠাল ও মাছের চিপস তৈরি করে স্থানীয় বাজারে অল্প পরিসরে বিক্রি শুরু করেন। শুরুতে ন্যান্সির পণ্য উৎপাদন, নির্বাচন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ছিল। পরে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তার উৎসাহ আরও বেড়ে যায়।
গাজীপুর কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সহযোগিতায় ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য সনদসহ প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স সংগ্রহ করেন ন্যান্সি।
তার প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যান্সি অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড’ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে চারজন কাজ করছেন।
শুধু ন্যান্সিই নন, উদ্যমী তরুণদের আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করতে সারাদেশে উদ্যোক্তা তৈরির এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করেন, কৃষি দেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু এ খাতে বাস্তবসম্মত ও ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন না হওয়া এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি না হওয়ায় কৃষি খাত পিছিয়ে রয়েছে। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতেও কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর এ লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির এমন উদ্যোগ নিয়েছে।
এস এম/ ১০ অক্টোবর ২০২৬







