
কানাডার ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকের রাজনীতিতে বহুদিন পর আবার ফিরে এসেছে এমন একটি শব্দ, যা একসময় গোটা কানাডাকে দুই ভাগ করে দেওয়ার উপক্রম করেছিল, ‘রেফারেন্ডাম’। সোমবারের প্রাদেশিক নির্বাচনে স্বাধীনতাপন্থী Parti Québécois বা PQ সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে। তবে এই জয় পূর্ণাঙ্গ নয়। ১২ বছর পর ক্ষমতায় ফিরলেও PQ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সরকার চালাতে তাদের অন্য দলের সমর্থনের প্রয়োজন হবে।
প্রাথমিক ফলাফলে ১২৭ আসনের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে Paul St-Pierre Plamondon-এর নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতাপন্থী Parti Québécois (PQ) পেয়েছে ৫৯টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬৪টি। Quebec Liberal Party পেয়েছে ৪০টি, Conservative Party of Quebec ১৯টি এবং Québec solidaire ৯টি আসন। আট বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা Coalition Avenir Québec বা CAQ এবারের নির্বাচনে একটি আসনও ধরে রাখতে পারেনি। জনপ্রিয় ভোটের হিসাবে PQ পেয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ, যা কুইবেকের ইতিহাসে সরকার গঠনকারী কোনো দলের সর্বনিম্ন ভোটের হার।
এই ফলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক এখানেই। কুইবেকের ভোটাররা PQ-কে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু তাদের হাতে অবাধ রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেননি। পাঁচটি প্রধান দলের মধ্যে ভোট এতটাই বিভক্ত হয়েছে যে ৩০ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েও PQ সবচেয়ে বড় দল হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ নির্বাচনের ফলকে সরাসরি কুইবেকের স্বাধীনতার পক্ষে গণরায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বরং ফলাফল বলছে, কুইবেকের রাজনীতিতে একই সঙ্গে কয়েকটি স্রোত কাজ করেছে। দীর্ঘদিনের CAQ সরকারের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। ফেডারেলিস্ট ভোটের বড় অংশ লিবারেল ও কনজারভেটিভদের মধ্যে ভাগ হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ভোটের একটি অংশ PQ-র দিকে ফিরেছে। সেই বিভক্ত রাজনৈতিক মানচিত্রই Paul St-Pierre Plamondon-কে প্রিমিয়ারের দপ্তরে পৌঁছে দিয়েছে।
PQ দীর্ঘদিন ধরেই কুইবেককে কানাডা থেকে পৃথক করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। নির্বাচনী প্রচারণাতেও St-Pierre Plamondon এই লক্ষ্য গোপন করেননি। তিনি তৃতীয়বারের মতো স্বাধীনতা নিয়ে গণভোট আয়োজনের অঙ্গীকার করেছেন। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সেই গণভোট করতে চান না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে তিনি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে গণভোটের প্রশ্নটি তাৎক্ষণিক না হলেও PQ সরকারের মেয়াদের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলবে।
৫৯ জন সদস্য নিয়ে সরকার চালাতে হলে PQ-কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভোটে বিরোধী দলের সমর্থন নিতে হবে। বাজেট, আস্থা ভোট কিংবা বড় আইন পাসের ক্ষেত্রে তাদের একা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। Quebec Liberal Party এবং Conservative Party of Quebec উভয়েই প্রদেশটির স্বাধীনতার বিপক্ষে। অন্যদিকে Québec solidaire-ও কুইবেকের স্বাধীনতার পক্ষে, তবে স্বাধীনতা অর্জনের পথ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে দলটির সঙ্গে PQ-র গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফলে স্বাধীনতার প্রশ্নে দুই দলের অবস্থান কাছাকাছি হলেও সংসদে PQ যে সবসময় Québec solidaire-এর সমর্থন পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই সমীকরণ Paul St-Pierre Plamondon-এর সামনে একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। তিনি যদি সরকার পরিচালনার দৈনন্দিন বিষয়, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো ইস্যুতে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করেন, তাহলে স্বাধীনতার এজেন্ডা কিছুটা পেছনে যেতে পারে। আবার স্বাধীনতার প্রশ্নটি দ্রুত সামনে আনলে বিরোধী দলগুলো তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হতে পারে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, কুইবেকের স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন এখনো ৩০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ PQ-কে ভোট দেওয়া আর কুইবেকের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা এক কথা নয়। এবারের নির্বাচনের ফলও সেই পার্থক্যটি সামনে এনেছে।
১৯৮০ সালে প্রথম স্বাধীনতা গণভোটে সার্বভৌমত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এরপর ১৯৯৫ সালের দ্বিতীয় গণভোটে স্বাধীনতার প্রশ্নে কুইবেক প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেবার ‘না’ ভোট পেয়েছিল ৫০.৫৮ শতাংশ, আর ‘হ্যাঁ’ ভোট ৪৯.৪২ শতাংশ। ব্যবধান ছিল মাত্র ৫৪ হাজার ২৮৮ ভোট। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৯৩.৫২ শতাংশ। অর্থাৎ আধুনিক কানাডার ইতিহাসে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন এতটা কাছাকাছি ব্যবধানে আর কখনও পরীক্ষার মুখে পড়েনি।
সেই গণভোটের তিন দশকের বেশি সময় পর নতুন প্রজন্মের কুইবেকবাসী এখন ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাস করছে। তাদের সামনে ভাষা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাড়ির দাম, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, চাকরি, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ফলে স্বাধীনতার পুরোনো বিতর্ক নতুন করে শুরু হলেও এবারের রাজনৈতিক পরিবেশ ১৯৯৫ সালের অনুরূপ নয়।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি বড় গল্প CAQ-এর পতন। ২০১৮ সালে François Legault-এর নেতৃত্বে দলটি কুইবেকের রাজনীতিতে একটি নতুন পথ তৈরি করেছিল। স্বাধীনতা বনাম ফেডারেলিজমের পুরোনো দ্বন্দ্ব থেকে কিছুটা দূরে সরে কুইবেক জাতীয়তাবাদকে কানাডার ভেতরেই প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল তাদের রাজনীতির কেন্দ্র। পরপর দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের পর সেই দল এবার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে একটি আসনও পায়নি। তাই CAQ-এর পতনের পর কুইবেকের রাজনীতিতে আবার সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্নটি, কুইবেক কি কানাডার অংশ হিসেবেই থাকবে, নাকি স্বাধীনতার পথে এগোবে।







