আইন-আদালত

গুম-খুনের মামলায় শেষ ধাপে বিচার: জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আজ তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর – আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাদিক গুম ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বড় ধরনের অগ্রগতি হতে যাচ্ছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর General (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আজ ট্রাইব্যুনালে অবশিষ্ট সাক্ষ্য দেবেন মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে তার এই গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি গ্রহণ করা হচ্ছে।

আদালতের বিচারিক গতিপথ ও সাক্ষ্যগ্রহণের হালচাল

পাবলিক প্রসিকিউশনের সূত্র অনুযায়ী, এই স্পর্শকাতর মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার মূল জবানবন্দি দেওয়া শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর। সেদিন ১৫তম সাক্ষী হিসেবে রফিকুল ইসলামের আংশিক জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বাকি অংশের জন্য ৪ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে ওই দিন শুনানি সম্পন্ন না হওয়ায় আজ পুনর্নির্ধারিত দিনে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

প্রসিকিউশন আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছে, ইতোমধ্যে সংগৃহীত চাক্ষুষ প্রমাণ ও আলামতের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো আদালতের সামনে উন্মোচিত করা হয়েছে:

১৫ সাক্ষীর মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণের দাবি: প্রসিকিউশনের মতে, প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।

পরবর্তী ধাপ যুক্তিতর্ক: আজ তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই মামলাটি চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের (Arguments) পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তবে আইনানুগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আসামিপক্ষ চাইলে তাদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে পারবে।

জব্দকৃত আলামত ও শেষ চাক্ষুষ সাক্ষী: এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর মামলার ১৪তম সাক্ষী কামরুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধারকৃত আলামতের বিবরণ তুলে ধরেন। একই দিনে র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা ও মামলার অন্যতম চাক্ষুষ সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা সমাপ্ত হয়।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা ভয়াবহ ৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পেশ করা ফরমাল চার্জে আসামির বিরুদ্ধে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে:

১. পুবাইলে ৩ হত্যা (২০১১): ২০১১ সালের ১১ জুলাই গভীর রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউল আহসানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে ‘সজল’সহ ৩ জনকে গুলি করে হত্যা।

২. বলেশ্বর নদীর মোহনায় ৫০ হত্যা (২০১০-২০১৩): ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ।

৩. সুন্দরবনে ক্রসফায়ারের নামে ৫০ হত্যা: একই সময়ে (২০১০-২০১৩) বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের গভীরে তথাকথিত ‘বনদস্যু দমন’-এর আড়ালে ‘মাসুদ’সহ ৫০ জনের প্রাণ নেওয়া।

মামলার পেছনের পটভূমি

এসব ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নেন। একই দিনে প্রসিকিউশনের ফরমাল চার্জ দাখিলের পর ২৩ ডিসেম্বর তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

আজ তদন্ত কর্মকর্তার শেষ জবানবন্দি গ্রহণের পর এই বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায়ের পথ কতটা প্রশস্ত হয়—এখন সেদিকেই অপলক দৃষ্টি সবার।

এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language