সম্পাদকের পাতা

অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় শাহজাহান খান

নজরুল মিন্টো

অস্ট্রেলিয়ার OAM পদক গ্রহণ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অধ্যাপক শাহজাহান খান
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ব্রিসবেনের Government House-এ কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ড. Jeannette Young-এর কাছ থেকে Order of Australia Medal গ্রহণ করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দিনটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ এক গৌরবের দিন হয়ে উঠেছিল। শিক্ষকতা, গবেষণা এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খানের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া মেডেল’। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কারও জন্য এটি ছিল এক বিরল অর্জন।

ব্রিসবেনের আনুষ্ঠানিক মঞ্চে কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ড. জেনেট ইয়ংয়ের হাত থেকে যখন পদকটি গ্রহণ করছিলেন শাহজাহান খান, তখন সেই মুহূর্তের পেছনে ছিল তিন দশকেরও বেশি সময়ের শিক্ষকতা, গবেষণা এবং সমাজের জন্য কাজ করার এক দীর্ঘ ইতিহাস। কানাডায় উচ্চশিক্ষা, সেখান থেকে দীর্ঘ একাডেমিক জীবন, বহু বছরের সেই পথচলা সেদিন এসে মিলেছিল দেশটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায়।

সম্মাননার ঘোষণা অবশ্য এসেছিল আরও আগে। ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, অস্ট্রেলিয়া দিবসে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয় ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া মেডেল’-এর জন্য। Order of Australia দেশটির জাতীয় সম্মাননা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্বীকৃতি। এর চারটি স্তরের একটি হলো Medal of the Order of Australia বা OAM, যা বিশেষ স্বীকৃতির যোগ্য সেবার জন্য দেওয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ব্রিসবেনে আনুষ্ঠানিকভাবে শাহজাহান খানের হাতে সেই পদক তুলে দেওয়া হয়।

শাহজাহান খানের জীবনের বড় অধ্যায়টি লেখা হয়েছিল কানাডায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান কানাডায়। ভর্তি হন ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পরিসংখ্যানে আরও একটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শুরু করেন পিএইচডি।

কানাডার সেই সময়টিই তাঁর গবেষণাজীবনের ভিত আরও মজবুত করে। পরিসংখ্যানকে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় হিসেবে নয়, গবেষণার গভীর জগৎ হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয় সেখানে। দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণা আর একাডেমিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন পরবর্তী জীবনের জন্য। ১৯৯২ সালে ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

এক অর্থে কানাডাই ছিল তাঁর জীবনের বড় বাঁক। বাংলাদেশ তাঁকে দিয়েছিল ভিত্তি, আর কানাডা খুলে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দরজা। সেখানেই তৈরি হয় সেই একাডেমিক পরিপক্বতা, যা পরে অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণাজীবনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

পিএইচডি শেষ করার পর একই বছর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। পরের বছর যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের দীর্ঘতম কর্মঅধ্যায়।

পরিসংখ্যান বিষয়ে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন শাহজাহান খান। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, গবেষণা, শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব, সব মিলিয়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি একটানা কাজ করে গেছেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ২৬০-এর বেশি। তাঁর তত্ত্বাবধানে ২০ জন শিক্ষার্থী পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছেন, গবেষণা কর্মশালায় বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

গবেষণায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। পেয়েছেন ইসেসকো স্বর্ণপদক ও ইসোস স্বর্ণপদকসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার। কিন্তু সংখ্যার বাইরে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয়েছে শিক্ষক হিসেবে। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর একাডেমিক যাত্রার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে গেছে।

২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড তাঁকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত করে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম কোনো শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির এই মর্যাদা অর্জন করেন।

এর পরের বছর আসে আরও একটি বিশেষ স্বীকৃতি। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর নামে চালু হয় ‘অধ্যাপক শাহজাহান খান বৃত্তি’। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জীবনের এতগুলো বছর শিক্ষকতা ও গবেষণায় কাটিয়েছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁর নাম বহন করতে শুরু করে একটি বৃত্তি। একজন শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবনের জন্য এমন স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে আলাদা তাৎপর্য বহন করে।

অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিনের জীবন গড়ে উঠলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক নতুন রূপ পেয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক একাডেমিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার দেশের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন শাহজাহান খান। টুওউম্বার ইসলামিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শহরটির প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং পরে গার্ডেন সিটি মসজিদ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

দীর্ঘ একাডেমিক জীবন, গবেষণা এবং সমাজের জন্য কাজ করার যে পথ শাহজাহান খান বেছে নিয়েছিলেন, ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া মেডেল’ সেই পথেরই এক মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। প্রবাসী একজন বাংলাদেশির এই অর্জন তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের জন্যও হয়ে উঠেছে গর্বের একটি অধ্যায়।

এনএন/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬




FAQ

প্রশ্ন: অধ্যাপক শাহজাহান খান কী সম্মাননা পেয়েছেন?
উত্তর: তিনি অস্ট্রেলিয়ার Medal of the Order of Australia (OAM) পেয়েছেন।

প্রশ্ন: শাহজাহান খান কবে OAM পদক গ্রহণ করেন?
উত্তর: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ব্রিসবেনের Government House-এ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদকটি গ্রহণ করেন। G

প্রশ্ন: কে শাহজাহান খানের হাতে OAM তুলে দেন?
উত্তর: কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ড. Jeannette Young তাঁর হাতে পদকটি তুলে দেন।

প্রশ্ন: কেন শাহজাহান খান OAM পেয়েছেন?
উত্তর: অস্ট্রেলিয়া সরকারের সরকারি citation অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার ইসলামিক কমিউনিটিতে তাঁর সেবার জন্য তাঁকে OAM দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন: শাহজাহান খান কোথায় অধ্যাপনা করেছেন?
উত্তর: তাঁর দীর্ঘ একাডেমিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে University of Southern Queensland-এ, যেখানে তিনি Statistics-এর Founding Professor ছিলেন।

প্রশ্ন: শাহজাহান খান কি বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
উত্তর: তিনি Asian University of Bangladesh-এর Vice Chancellor হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০২৬ সালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এই পদে ছিলেন।

Back to top button
🌐 Read in Your Language