৮ দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে এমপি গাজী নজরুল: আদালতে চাঞ্চল্যকর তথ্যের বিস্ফোরণ

ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর – সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন (১৯) আত্মহত্যা মামলার তদন্তে একে একে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক সব তথ্য। দুই দফায় মোট ৮ দিনের রিমান্ড শেষে শেরেবাংলা নগর ন্যাম ভবনে ২য় স্ত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আদালতকে জানিয়েছে, সংসদ সদস্যের ফ্ল্যাটের শয়নকক্ষে ১ম স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন এমপি, আর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে রাত কাটাতে হতো শয়নকক্ষের পাশের খোলা বারান্দায়! দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর পথ বেছে নেন ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এমপি গাজী নজরুলকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ডিবি তদন্তে উঠে আসা শিউরে ওঠার মতো তথ্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি তেজগাঁও জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন রিমান্ড প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেন:
নাতনি থেকে বিয়ে: মামলার বাদী (মরিয়মের বাবা) গাজী নজরুলের সম্পর্কে ভাগিনা হন। সে সূত্রে মরিয়ম সম্পর্কে নজরুলের নাতনি ছিলেন। ঢাকা এলে এমপি সেখানে থাকতেন এবং সেই সুবাদেই সখ্য গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৬ জুন তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়।
বারান্দায় রাতযাপন ও নির্যাতন: বিয়ের পর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে ১ম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সাথেই মরিয়মকে রাখা হতো। তবে স্ত্রী হিসেবে ন্যূনতম মর্যাদা দেওয়া হতো না। এমপি ও ১ম স্ত্রী শোবার ঘরে ঘুমাতেন, আর মরিয়মকে পাশের বেলকনিতে (বারান্দায়) রাত কাটাতে হতো।
মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন: রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারী দল নিশ্চিত হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে একই ছাদের নিচে রেখে মরিয়মের ওপর চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো, যা তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।
“দীর্ঘদিন এভাবে মানবেতর অবস্থায় রাখার পর মরিয়মকে নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়, যার ফলে তিনি আত্মহত্যা করেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এমন স্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।”— হারুনুর রশিদ (সহকারী পাবলিক প্রসিবিউটর)
আদালতে জামিন আবেদন ও আইনি লড়াই
আদালতে শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুল ইসলাম যুক্তি দেখান যে, গাজী নজরুল ইসলাম একজন সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও হার্টের রোগী। পারিবারিক অভিমানেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে দাবি করে তারা জামিনের আবেদন জানান। তবে আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে এবং মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে সোজা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পটভূমি: ফ্ল্যাটে মিলল ঝুলন্ত লাশ ও আত্মহত্যার চিরকুট
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শেরেবাংলা নগর থানার ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে সিআইডি ও পুলিশ। ভেতরে ঘর বন্ধ থাকা অবস্থায় কক্ষ থেকে কিছু চিরকুটও উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পরপরই নিহতের বাবা বাদী হয়ে এমপি নজরুল ইসলাম, তার ১ম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ সেদিন রাতেই এমপি ও তার ১ম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে। ১ম স্ত্রী মাকছুদাও ১ দিনের রিমান্ড শেষে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এনএন/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬







