আইন-আদালত

দুদকের প্রেস ব্রিফিংয়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আসিফ মাহমুদের

ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর – কোনো দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর দিনই গণমাধ্যমের সামনে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে দেওয়া বক্তব্য কতটা আইনসম্মত? কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই কি গণমাধ্যমের সামনে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়?

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রেস ব্রিফিং পদ্ধতি ও তথাকথিত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে এই রিট আবেদনটি (রিট পিটিশন নং ১৩৮৮৫/২০২৬) দায়ের করেন। রিটে তদন্ত বা অনুসন্ধানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই গণমাধ্যমে মানহানিকর প্রেস ব্রিফিং করা থেকে সংস্থাসমূহকে বিরত রাখার আর্জি জানানো হয়েছে।

আইনি লড়াইয়ের নেপথ্যে: ঠিক কী ঘটেছিল?

রিটের তথ্য ও ঘটনার ক্রমপঞ্জি বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান দিক উঠে আসে:

১. অনুসন্ধানের শুরুতে ‘সত্যতা পাওয়ার’ দাবি: গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দুদকের এক ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির উপ-পরিচালক জানান, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’। অথচ আইনি মতে, সত্যতা যাচাই হলো অনুসন্ধানের শেষ ধাপ, শুরুর নয়।

২. ‘মুখ ফসকে বলা’ বনাম প্রচারের অভাব: পরবর্তীতে ৯ সেপ্টেম্বর দুদকের সচিব বক্তব্যটিকে ‘স্লিপ অব দ্য টাং’ বা অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে স্বীকার করেন। তবে যে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদটি প্রচার হয়েছিল, সেভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার বিজ্ঞপ্তি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।

৩. পুনরায় নতুন অভিযোগের অবতারণা: গত ১০ সেপ্টেম্বর পাঠানো আইনি নোটিশ উপেক্ষা করে ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের আরেক কর্মকর্তা ডিএনসিসির প্রশাসক নিয়োগ, ডিসি পদায়ন, টেন্ডার ও অর্থপাচারের মতো বহুবিধ নতুন অভিযোগ তুলে ফের প্রেস ব্রিফিং করেন।

“কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর দিনই গণমাধ্যমের সামনে বিচারকের মতো রায় দেওয়া আইনি এখতিয়ারবহির্ভূত। এটি স্পষ্টতই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি।”
— অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা (রিটকারীর আইনজীবী)

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও আসিফ মাহমুদের যুক্তি

রিট আবেদনে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক দাবি করে কিছু স্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরেছেন আসিফ মাহমুদ:

পদোন্নতির সময়ের অমিল: ১৫০ জন সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার যে পদোন্নতির কথা বলা হয়েছে, তা আসিফ মাহমুদের পদত্যাগের (১১ ডিসেম্বর ২০২৫) প্রায় পাঁচ মাস পর (১১ মে ২০২৬) বাস্তবায়িত হয়। ফলে এতে তার যুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই।

প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব বাতিলের বিষয়টিও প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের আইনি আদেশের ভিত্তিতেই হয়েছে।

ডিএনসিসি নির্বাচন ও মিডিয়া ট্রায়াল: রিটে দাবি করা হয়, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণার পর সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ পরিচালনা করা হচ্ছে।

জনমনে প্রতিক্রিয়া ও আইনি গুরুত্ব

ঘটনাটি নিয়ে নেটপাড়ায় ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। আইনের সচেতন মহলের মতে, দুর্নীতির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান যেমন জরুরি, তেমনই কোনো নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে জনসমক্ষে অপরাধী হিসেবে চিত্রায়িত করাও বন্ধ হওয়া দরকার। হাইকোর্টের এই রিটের রায় ভবিষ্যতে যেকোনো তদন্তকারী সংস্থার গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সীমা নির্ধারণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

এনএন/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language