পাকিস্তানের সামরিক অভিযান ঠেকাতে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি তালেবানের, সৌদিকে মধ্যস্থতার আহ্বান

কাবুল,১৯ সেপ্টেম্বর- আফগানিস্তানের ভেতরে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হলে পাকিস্তানকে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির তালেবান সরকার। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা কমাতে সৌদি আরবকে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে কাবুল।
তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আল-আরাবিয়া ইংলিশকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।
তিনি পাকিস্তানের সেই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে ইসলামাবাদ দাবি করে আসছে—আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে।
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তান যদি আত্মরক্ষার অধিকার বা জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা বলে আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তাহলে আফগানিস্তানেরও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার রয়েছে।
তার ভাষায়, “আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হলে তালেবান ‘চূর্ণবিচূর্ণ জবাব’ দেবে।”
পাকিস্তানের অভিযোগ অস্বীকার
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এর আগে আল-আরাবিয়া ইংলিশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্রও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন।
তার বক্তব্যের জবাবে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, আফগানিস্তানের মাটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালানোর জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া তালেবানের নীতি নয়।
তিনি বিশেষভাবে টিটিপির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ এই গোষ্ঠীকে দেওয়া হয় না। তালেবান অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকেও সমর্থন করে না বলে দাবি করেন তিনি।
পাকিস্তানের সমস্যা অভ্যন্তরীণ
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের দাবি, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের শিকড় তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগেও ছিল। টিটিপি ও বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সংঘাত বহুদিনের।
তার বক্তব্য, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য আফগানিস্তানকে দায়ী না করে ইসলামাবাদের উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়া।
তবে পাকিস্তান নিয়মিতভাবেই আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির উপস্থিতি ও সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলার অভিযোগ তুলে আসছে। তালেবান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সীমান্ত উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংঘাত নয়, সংলাপ চায় তালেবান
হুঁশিয়ারির পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। তিনি বলেন, আফগানিস্তান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি এবং মতবিরোধ নিরসনে সংলাপ চায়।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের বক্তব্য অনুযায়ী, পারস্পরিক যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সীমান্তপারের নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের উদ্বেগ কমানো সম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তুরস্ক, কাতার ও চীনও বিভিন্ন সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে।
মধ্যস্থতায় সৌদি আরবকে চায় কাবুল
পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে সৌদি আরবের আরও সক্রিয় ভূমিকা চান মুজাহিদ। তার মতে, সৌদি আরব আফগানিস্তান ও পাকিস্তান—উভয় দেশেরই বন্ধু। ফলে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ কমাতে রিয়াদ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক আরও জোরদার করার আগ্রহও প্রকাশ করেন। আফগানিস্তানের পুনর্গঠন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও সৌদির ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে সৌদি আরব অতীতেও মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। গত বছর সীমান্ত সংঘর্ষের পর পাকিস্তানি সেনাদের আটক করার ঘটনাতেও সৌদি মধ্যস্থতার মাধ্যমে তিন পাকিস্তানি সেনাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই জটিল হয়েছে। সীমান্তে গোলাগুলি, বিমান হামলা, ড্রোন তৎপরতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ড থেকে টিটিপি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশ দুই পক্ষকে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
এরই মধ্যে তুরস্ক ও কাতারও দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলে প্রতিরোধের ঘোষণা
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের বক্তব্যে একদিকে পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আগ্রহ—দুই ধরনের বার্তাই উঠে এসেছে।
তালেবানের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান নিজের ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সামরিক অভিযান মেনে নেবে না। একই সঙ্গে দুই দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলায় গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সংলাপ জোরদারের পক্ষেও তারা।
ফলে ইসলামাবাদ-কাবুল সম্পর্কের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সীমান্তে নিরাপত্তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সামরিক চাপের মধ্যেও দুই পক্ষ কি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমাতে পারবে?
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের বক্তব্য অন্তত ইঙ্গিত দিচ্ছে, তালেবান সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকলেও পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে চায়। আর সেই প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখতে আগ্রহী কাবুল।
এস এম/ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬







