এশিয়া

উত্তর কোরিয়ায় বাড়ছে বিলাসপণ্য ও বিনোদনের সুযোগ, ভোগ বাড়াতে কিমের নতুন উদ্যোগ

কিম

পিয়ংইয়ং, ১৪ সেপ্টেম্বর- উত্তর কোরিয়া বললেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক মহড়া আর নানা ধরনের বিধিনিষেধের চিত্র। কিন্তু সেই দেশেই এখন বিনোদন ও ভোগের সুযোগ বাড়ছে। বিলাসবহুল বিপণিবিতান, সৈকতকেন্দ্র, জলকেলি কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, এমনকি পোষা প্রাণীর দোকানও গড়ে উঠছে। আর এর পেছনে রয়েছেন দেশটির নেতা কিম জং উন।

রয়টার্সের বাণিজ্যিক তথ্য ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া ভ্রমণকারী পর্যটক ও দেশত্যাগীদের সাক্ষাৎকারে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

চীনের শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে উত্তর কোরিয়ায় মালিশের সরঞ্জাম আমদানি প্রায় ৪০ গুণ বেড়েছে। ব্যায়ামের যন্ত্রের আমদানি বেড়েছে ৬০০ শতাংশের বেশি। দেশটিতে পিয়ানো, হাতঘড়ি ও বিনোদনমূলক সরঞ্জামের আমদানিও বেড়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত চীন থেকে তিন টনের বেশি ব্যাটারিচালিত বাম্পার কার আমদানি করেছে উত্তর কোরিয়া।

পিয়ংইয়ংয়ে গত বছর চালু হওয়া রাংনাং এগুক কুমগাং সার্ভিস কমপ্লেক্সে মানুষ কফি পান করছেন, ঘরের বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনছেন। রিউগিয়ং গোল্ডেন প্লাজায় রোলেক্স, ওমেগা ও হারবেলিনের মতো ঘড়ির ব্র্যান্ডের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। একটি ইলেকট্রনিকসের দোকানে হুয়াওয়ের নামও রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ায় তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বিক্রেতা বা পরিবেশক নেই।

শুধু কেনাকাটা নয়, বিনোদনের সুযোগও বাড়ছে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে চালু হয়েছে ওয়ানসান কালমা সৈকতকেন্দ্র। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সেখানে তিন লাখের বেশি স্থানীয় পর্যটক গিয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠছে জলকেলি কেন্দ্র, সাঁতারকেন্দ্র, খেলাধুলার জায়গা, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁ। অন্তত দুই ডজন বিনোদনকেন্দ্র ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বা নির্মাণাধীন।

বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য শুধু নাগরিকদের বিনোদনের সুযোগ দেওয়া নয়। ব্যক্তিগত অর্থ যাতে অনানুষ্ঠানিক বাজারের বদলে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় ব্যয় হয়, সেটিই কিমের বড় লক্ষ্য। এতে সরকারের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, অনানুষ্ঠানিক বাজার দুর্বল হবে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়িয়ে অর্থনীতিতেও গতি আনা সম্ভব হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকদের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা পাঠানো এবং কয়লা ও অন্যান্য খনিজ রপ্তানি থেকেও দেশটির আয় বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়ে উত্তর কোরিয়া সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুডিগার ফ্রাঙ্কের মতে, উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যাদের হাতে সঞ্চয় থাকলেও তা খরচ করার সুযোগ সীমিত। কিমের ভোগ বাড়ানোর নীতি সেই অর্থ ব্যবহারের পথ তৈরি করছে। এতে অসন্তোষ কিছুটা কমার পাশাপাশি চালের মতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপও কমতে পারে।

তবে এই সুবিধা সবার জন্য নয়। পিয়ংইয়ংয়ের সাবেক চালক ও বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসকারী ইয়াং ইল-চেওল বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য নতুন রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। অনেকেই সরকারের ওপর আস্থা না থাকায় ডিজিটাল লেনদেনের বদলে নগদ অর্থ ব্যবহার করেন।

ফ্রাঙ্কের ভাষায়, ‘ভোগ ও বিনোদন সরকারকে টিকিয়ে রাখার মতো সময় কিনে দেয়। তবে তা কখনোই চিরদিনের জন্য মানুষের আনুগত্য কিনে দিতে পারে না।’

এস এম/ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language