জাতীয়

জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা নাহিদ ইসলামের

ঢাকা, ১২ আগস্ট – দেশে চলমান তীব্র লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকটের পেছনে বর্তমান বিএনপি সরকারের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও নীতিগত গলদকে দায়ী করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।

বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক কড়া বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও বাস্তবে এখন দেশে ‘অলিগার্কদের সরকার’ বা গুটিকয়েক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সরকার গড়ে তুলছে।

এক নজরে নাহিদ ইসলামের প্রধান অভিযোগসমূহ

বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক সুনির্দিষ্ট নীতিগত অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার তথ্য তুলে ধরেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ:

বিপিসি (BPC) নীতিমালায় তাড়াহুড়ো ও চেয়ারম্যান অপসারণ: বসুন্ধরা গ্রুপ পরিশোধিত তেল আমদানির প্রস্তাব দেওয়ার পর বিপিসিকে মাত্র ৪ দিনে নীতিমালার খসড়া তৈরি করতে বলা হয়। এর বিরোধিতা করায় বিপিসির চেয়ারম্যানকে অন্যায্যভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন: জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে ১০ দিনে নামিয়ে আনায় বড় বৈশ্বিক সরবরাহকারীরা বাদ পড়বে এবং বিশেষ সিন্ডিকেটের দর বাড়ে কমিশন বাণিজ্য সহজ হবে।

রিজার্ভ নিয়ে অজুহাত খারিজ: সরকারের “অর্থ নেই” বক্তব্য নাকচ করে তিনি জানান, দেশে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার এবং আগস্টের প্রথম ৮ দিনেই ৯১৫ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। মূল সংকট অর্থের নয়, টাইমলি আমদানির শিডিউল না থাকা।

ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং: গত ১০ আগস্ট রাতে দেশে রেকর্ড ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। বর্তমানে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ এবং গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

সংকট নিরসনে এনসিপি’র ১৫ দফা প্রস্তাবনা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে মাফিয়ামুক্ত ও সচল করতে ৩টি মেয়াদে ১৫ দফার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রস্তাব পেশ করেছেন নাহিদ ইসলাম:

প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে করণীয় (জরুরি পদক্ষেপ):

১. তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে উন্মুক্ত অংশীজনের আলোচনার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করা।

২. আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে পুনরায় আগের ৪২ দিনে ফিরিয়ে নেওয়া।

৩. বিপিসির সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর আমদানির শিডিউল দ্রুত অনুমোদন ও চার-ছয়টি প্রান্তিকের অগ্রিম ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা।

৪. মহেশখালী এফএসআরইউ (FSRU) দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে আনা।

৫. গ্যাস বরাদ্দে তথ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার সূচক চালু করা।

আগামী ৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে করণীয় (মধ্যমেয়াদী):

৬. বিপিসির একচেটিয়া প্রভাব ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র চালু করা।

৭. পরিশোধিত তেলের বদলে অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ দিয়ে দেশে রিফাইনারি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ করা।

৮. কুইক রেন্টাল ও আইপিপির (IPP) ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও দায়মুক্তি আইন বাতিল করা।

৯. ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস কমানো ও বকেয়া আদায়ের বাধ্যবাধকতা দেওয়া।

১০. বিদ্যুৎ বিলে স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করা।

১১. এলপিজির একচেটিয়া বাজার ভাঙতে নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত করা।

১২. মহেশখালীর বাইরে ৩য় ও ৪র্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা।

১৩. সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিএসসি (PSC) উন্নীত করা।

১৪. ‘বাপেক্স’-এ বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিদেশিদের সাথে যৌথ অনুসন্ধানে নামা।

১৫. সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও ইনভার্টারের শুল্ক শূন্যে নামিয়ে এনে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়া।

“শাসক নয়, ব্যবস্থা বদলাতে রক্ত দিয়েছে মানুষ”

বিবৃতি শেষে নাহিদ ইসলাম সতর্ক করে বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ রক্ত দিয়েছিল পুরো ব্যবস্থা বদলানোর জন্য, শুধু এক দল থেকে অন্য দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নয়। বিএনপি সরকার যদি পতিত সরকারের মতো ‘মাফিয়া তোষণ’ ও গুটিকয়েক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপকে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটে, তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে রাজপথে তার শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

এনএন/ ১২ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language