মধ্যপ্রাচ্য

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে কি নতুন শক্তির মেরুকরণ?

রিয়াদ, ৮ আগস্ট – সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে অঞ্চলটিতে ইসরায়েল ও ইরানকেন্দ্রিক বিদ্যমান শক্তির বাইরে একটি তৃতীয় শক্তিশালী অক্ষ বা জোটের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

তবে এই জোট বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং প্রয়োজনে এক দেশ অন্য দেশের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। গত শুক্রবার দেশ তিনটির মধ্যে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স প্যাক্ট বা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া একই ধরনের একটি চুক্তির বর্ধিত রূপ।

এই সমন্বয়ের ফলে ভবিষ্যতে এমন একটি আঞ্চলিক বলয় তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি ইসরায়েল বা ইরানের নেতৃত্বাধীন কোনো শিবিরের অংশ হবে না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল জাজিরাকে জানান যে, চুক্তিতে বিবেচনা করা উচিত শব্দের ব্যবহার এটি নিশ্চিত করে না যে আক্রান্ত দেশের পক্ষে অন্য দুই দেশ অবশ্যই অস্ত্র ধরবে।

পাকিস্তান বর্তমানে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনায় লিপ্ত এবং অতীতে ভারতের সঙ্গেও সামরিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির। অন্যদিকে সৌদি আরব তেহরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর হুমকির মুখে রয়েছে এবং তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে এক দেশের প্রয়োজনে অন্য দেশের এগিয়ে আসার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েল ও ইরানের সরাসরি সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা চিত্র বদলে দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও ২০২২ সাল থেকে দেশ দুটি পুনরায় ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল ভিত্তি হলো তিন দেশের বিশেষ সক্ষমতার সমন্বয়।

পাকিস্তানের রয়েছে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও বিশাল সামরিক বাহিনী। তুরস্ক উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্পে সমৃদ্ধ। আর সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি। এই তিন শক্তির মেলবন্ধন এই জোটকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর অতি নির্ভরতা কমানোর একটি প্রচেষ্টাও এই চুক্তির পেছনে কাজ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা মিত্রদের বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।

যদিও এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় বলে দাবি করা হয়েছে, তবুও ইসরায়েল ও ইরানের প্রভাব মোকাবিলাই এর অন্যতম লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে মিসর, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এই জোটে যুক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর।

এস এম/ ৮ আগস্ট ২০২৬


Back to top button