যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের শীর্ষ সারিতে কানাডা
নজরুল মিন্টো

বিমানবন্দরে একই সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন যাত্রী। দুজনের হাতেই পাসপোর্ট, দুজনের গন্তব্যও একই। অথচ একজন কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সোজা ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলেন। অন্যজনকে দেখাতে হলো আগাম ভিসা, আমন্ত্রণপত্র, থাকার ঠিকানা, ব্যাংক হিসাব ও আরও নানা কাগজপত্র। এই পার্থক্য শুধু দুই যাত্রীর নয়, তাঁদের হাতে থাকা দুটি পাসপোর্টেরও।
কোন দেশের নাগরিক পৃথিবীর কতটি গন্তব্যে সহজে যেতে পারবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করে তাঁর পাসপোর্টের শক্তির ওপর। সেই হিসাবে কানাডিয়ানদের নীল পাসপোর্ট আবারও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রকেও পেছনে ফেলেছে কানাডা।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী কানাডার অবস্থান সপ্তম। কানাডিয়ান পাসপোর্টধারীরা প্রচলিত ভিসা না নিয়ে ১৮৩টি গন্তব্যে যেতে পারেন। অন্যদিকে ১৮০টি গন্তব্যে একই ধরনের প্রবেশসুবিধা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে দশম স্থানে।
বিশ্বের ১৯৯টি পাসপোর্ট এবং ২২৭টি ভ্রমণ গন্তব্যের তথ্য নিয়ে এই সূচক তৈরি করে হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স। এ কাজে মূল তথ্য নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা বা আইএটিএর কাছ থেকে। কোনো পাসপোর্টধারী আগাম প্রচলিত ভিসা ছাড়া কতটি গন্তব্যে যেতে পারেন, তার ভিত্তিতে স্কোর নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে সরাসরি ভিসামুক্ত প্রবেশের পাশাপাশি ভিসা অন অ্যারাইভাল, ভিজিটর পারমিট এবং নির্দিষ্ট ধরনের ইলেকট্রনিক ভ্রমণ অনুমতিও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকার শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির নাগরিকরা আগাম প্রচলিত ভিসা ছাড়া ১৯২টি গন্তব্যে যেতে পারেন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ১৮৮টি গন্তব্য নিয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় এবং ১৮৭টি গন্তব্য নিয়ে সুইডেন তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এরপর তালিকার ওপরের অংশে রয়েছে ইউরোপের একগুচ্ছ দেশ। ১৮৩টি গন্তব্যে প্রবেশসুবিধা নিয়ে কানাডা কয়েকটি দেশের সঙ্গে সপ্তম স্থানে রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি আবারও বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাজনক পাসপোর্টধারী রাষ্ট্রগুলোর কাতারে জায়গা করে নিয়েছে।
এক দশক আগে উত্তর আমেরিকার দুই দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী ছিল। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম স্থানে ছিল এবং কানাডা উঠেছিল দ্বিতীয় স্থানে, যা এখন পর্যন্ত কানাডার সর্বোচ্চ অবস্থান। পরবর্তী সময়ে কানাডিয়ানদের ভ্রমণসুবিধা বড় আকারে কমে যায়নি। বরং এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ দ্রুত নতুন ভিসা-ছাড় চুক্তি করায় প্রতিযোগিতায় কানাডার অবস্থান নিচে নেমেছে। তবে ২০২৬ সালে সপ্তম স্থানে উঠে এসে কানাডা আবারও দেখিয়েছে, তার নীল পাসপোর্ট এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভ্রমণ নথিগুলোর একটি।
দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে ছবিটি একেবারেই ভিন্ন। এ অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট মালদ্বীপের। বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ৫২তম। এর নাগরিকরা ৯৩টি গন্তব্যে আগাম ভিসা ছাড়া বা সহজ প্রবেশসুবিধায় যেতে পারেন। এরপর ভারত রয়েছে ৮১তম স্থানে, যার নাগরিকদের জন্য এমন গন্তব্যের সংখ্যা ৫৫। শ্রীলঙ্কা রয়েছে ৯৪তম স্থানে এবং দেশটির পাসপোর্টধারীরা ৩৯টি গন্তব্যে সহজ প্রবেশসুবিধা পান।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নিচের সারির দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। দেশটির অবস্থান ৯৫তম এবং বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৭টি গন্তব্যে আগাম প্রচলিত ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। নেপাল রয়েছে ৯৬তম এবং পাকিস্তান ৯৮তম স্থানে। তালিকার একেবারে নিচে থাকা আফগানিস্তানের পাসপোর্ট বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল পাসপোর্ট হিসেবে বিবেচিত।
দুই দশক আগে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বের ৬৮তম স্থানে ছিল। ভারতের অবস্থান ছিল ৭১তম, অর্থাৎ বাংলাদেশ তখন প্রতিবেশী ভারতকেও ছাড়িয়ে ছিল। তবে সে সময় পাকিস্তানের পাসপোর্টে সহজ প্রবেশসুবিধা ছিল মাত্র ১৭টি গন্তব্যে, যা বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় অনেক কম। পরবর্তী দুই দশকে আন্তর্জাতিক ভিসা চুক্তি, কূটনৈতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশ সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ২০২১ সালে দেশটি নেমে যায় ১০৮তম স্থানে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি হলেও ২০০৬ সালের অবস্থানে ফিরতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
তবে ১৮৩টি কিংবা ৩৭টি গন্তব্যে প্রবেশসুবিধা থাকার অর্থ এই নয় যে, সব দেশে কোনো অনুমতি বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ঢোকা যাবে।
কিছু গন্তব্যে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। সেখানে ভ্রমণের আগে দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে ভিসা নিতে হয় না। আবার অনেক দেশে রয়েছে ভিসা অন অ্যারাইভাল ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে যাত্রী গন্তব্যের বিমানবন্দর বা সীমান্তে পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখান, নির্ধারিত ফি দেন এবং সেখানেই ভিসা সংগ্রহ করেন। এতে আগাম ভিসার ঝামেলা কমে, কিন্তু এটিকে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত ভ্রমণ বলা যায় না।
কিছু দেশ ভিসামুক্ত যাত্রীদের জন্যও আগাম ইলেকট্রনিক ভ্রমণ অনুমতি বাধ্যতামূলক করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি ESTA, যুক্তরাজ্যে ETA এবং কানাডায় eTA নামে পরিচিত। এসব ক্ষেত্রে দূতাবাসে গিয়ে ভিসা নিতে হয় না, কিন্তু যাত্রার আগে অনলাইনে আবেদন করে অনুমোদন নিতে এবং নির্ধারিত ফি দিতে হয়। অনুমতি ছাড়া বিমান সংস্থা যাত্রীকে উড়োজাহাজে উঠতে না-ও দিতে পারে।
পাসপোর্টের শক্তি শুধু ধনী রাষ্ট্র হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কূটনৈতিক সম্পর্ক, পারস্পরিক ভিসা-ছাড় চুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা। একটি দেশ যত বেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা ও পারস্পরিক প্রবেশসুবিধার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তার নাগরিকদের জন্য পৃথিবীর দরজাও তত সহজে খুলে যায়।
তবে শক্তিশালী পাসপোর্ট হাতে থাকলেই কোনো দেশে প্রবেশের নিশ্চয়তা মেলে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গন্তব্য দেশের সীমান্ত কর্মকর্তার হাতে থাকে এবং প্রবেশের নিয়মও যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। তাই টিকিট কাটার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে ভিসা, ভিসা অন অ্যারাইভালের ফি, ইলেকট্রনিক অনুমতি, পাসপোর্টের মেয়াদ এবং অন্যান্য শর্ত যাচাই করা জরুরি।
একটি পাসপোর্ট তাই শুধু নাগরিকের নাম, ছবি আর জন্মতারিখ বহন করে না। এর পাতায় বহন করে একটি দেশের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্কের গল্প। সেই গল্পে কানাডা আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে দেখিয়েছে, বিশ্বমঞ্চে শক্তি শুধু অর্থনীতি কিংবা সামরিক ক্ষমতায় মাপা হয় না। কখনও কখনও একটি পাসপোর্টই বলে দেয়, পৃথিবীতে কার সম্মান, কার শক্তি কতটুকু!
এনএন/ ২৬ জুলাই ২০২৬









