সম্পাদকের পাতা

যে ছোট্ট হাত ধরে বিশ্বকাপের মাঠে নামেন বিশ্বতারকারা

নজরুল মিন্টো

গ্যালারিতে হাজারো কণ্ঠ মিলে উঠেছে সমুদ্রের গর্জনের মতো। দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে কেউ গান গাইছেন, কেউ প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম ধরে ডাকছেন, কেউ মোবাইল ফোন উঁচু করে ধরে রাখতে চাইছেন জীবনের স্মরণীয় কয়েকটি মুহূর্ত। মাঠে সাজানো শেষ প্রস্তুতি, ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠে উত্তেজনা, ক্যামেরাগুলো তাক করা টানেলের দিকে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে বসে আছেন। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার আগে স্টেডিয়ামের টানেলের ভেতরে তখন রচিত হচ্ছে আরেকটি গল্প।

টানেলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ফুটবলাররা। যাঁদের একটি গোলের অপেক্ষায় থাকে পুরো দেশ, যাঁদের ছবি ছাপা হয় সংবাদপত্রের প্রথম পাতায়। অথচ সেই মুহূর্তে তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। কেউ বারবার নিজের পোশাক ঠিক করছে, কেউ জুতার ফিতা দেখে নিচ্ছে, কেউ আড়চোখে পাশের বিশ্বতারকাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কারও চোখে বিস্ময়, কারও ঠোঁটে চাপা হাসি, আবার কেউ এমন গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ম্যাচের ফলাফলের দায়িত্বও তার কাঁধে।

একটি শিশু শক্ত করে ধরে আছে পাশের ফুটবলারের হাত। একটু পর টানেলের অন্ধকার পেরিয়ে সে ঢুকে পড়বে আলোয় ভরা মাঠে। হয়তো উত্তেজনায় তাকে শেখানো হাঁটার ছন্দ ভুলে যাবে, হয়তো গ্যালারিতে পরিচিত কাউকে দেখে হাত নাড়ার লোভ সামলাতে পারবে না। এই পথচলা এক মিনিটেরও কম, কিন্তু পরে বহু বছর ধরে সে গল্প করে যাবে, একদিন বিশ্বকাপের মাঠে তার পাশে কে দাঁড়িয়েছিলেন।

বিশ্বকাপের ভাষায় এই শিশুদের বলা হয় ‘প্লেয়ার এসকর্ট’। ম্যাচ শুরুর আগে তারা একজন ফুটবলারের সঙ্গী হয়ে টানেল থেকে মাঠে আসে এবং সাধারণত জাতীয় সংগীত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

আজ দৃশ্যটি বিশ্বকাপের পরিচিত অনুষঙ্গ হলেও এর ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। নব্বইয়ের দশকে ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল ম্যাচে শিশুদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে আসতে দেখা যায়। ২০০০ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিটি ফুটবলারের পাশে একজন করে শিশু রাখার পর রীতিটি বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলাদা পরিচিতি পায়।

বিশ্বকাপে শিশুদের এই উপস্থিতি বিশেষ অর্থ পায় ২০০২ সালে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত সেই আসরের আগে ফিফা ও ইউনিসেফ ‘সে ইয়েস ফর চিলড্রেন’ নামে শিশু অধিকারবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান শুরু করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খেলাধুলা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে ওঠার অধিকার ছিল এর মূল বার্তা। ফলে খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে আসা শুধু সুন্দর একটি আনুষ্ঠানিকতা রইল না, শিশুদের অধিকারের কথাও পৌঁছে দিল বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে।

এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই হাজারো শিশু এই সুযোগ পেয়েছে। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ৪৭টি দেশের ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১ হাজার ৪০৮ শিশু প্লেয়ার এসকর্ট হিসেবে অংশ নেয়। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপেও একই সংখ্যক শিশুকে দেখা যায় খেলোয়াড়দের পাশে।

এই শিশুদের কীভাবে নির্বাচন করা হয়, সেই প্রশ্নও অনেকের মনে আসে। এর একটিমাত্র নিয়ম নেই। বিশ্বকাপের আয়োজক শহর, স্থানীয় ফুটবল সংগঠন, বিদ্যালয়, যুব উন্নয়ন প্রকল্প, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বকাপের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের বেছে নেয়। কোথাও প্রতিযোগিতা বা লটারির ব্যবস্থা থাকে, কখনো স্থানীয় ফুটবল প্রশিক্ষণে যুক্ত শিশুরা সুযোগ পায়। আবার কোথাও সুবিধাবঞ্চিত এলাকা, শরণার্থী পরিবার, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

আয়োজনভেদে বয়সসীমা বদলায়, তবে সাধারণত ছয় থেকে এগারো বছরের শিশুরাই বেশি সুযোগ পায়। অভিভাবকের সম্মতি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়া শেষ হলে শুরু হয় মহড়া। কখন সারিতে দাঁড়াতে হবে, কীভাবে হাঁটতে হবে, কোথায় থামতে হবে এবং জাতীয় সংগীত শেষে কোন পথে ফিরে আসতে হবে, সব আগেই দেখিয়ে দেওয়া হয়। ম্যাচের দিন তাদের দেওয়া হয় নির্ধারিত পোশাক। অনেকের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে যত্নে তুলে রাখা জামা।

একটি ম্যাচে দুই দলের শুরুর একাদশ মিলিয়ে ২২ জন ফুটবলার থাকেন, তাই সাধারণত সমানসংখ্যক শিশুকেও প্রস্তুত রাখা হয়। কে কার পাশে দাঁড়াবে, সেই খবর অনেক সময় ম্যাচের অল্প আগে জানানো হয়।

২০২৬ বিশ্বকাপে ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটন এলাকার একটি যুব উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের ২০ শিশু প্লেয়ার এসকর্ট হওয়ার সুযোগ পায়। তাদের অনেকেই আগে কখনো পেশাদার ফুটবল ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে যায়নি। কার হাত ধরে মাঠে নামবে, সেটিও তারা আগে থেকে জানত না। ফলে ম্যাচের আগের দিনগুলো কেটেছে অনুমান আর উত্তেজনায়।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্লেয়ার এসকর্ট, পতাকাবাহক ও বল সহায়ক হিসেবে প্রায় ৩ হাজার ২০০ শিশু ফিফার যুব কর্মসূচিতে অংশ নেয়। টেলিভিশনে তাদের উপস্থিতি কয়েক সেকেন্ডের হলেও সেই মুহূর্তের পেছনে যুক্ত থাকে বহু দেশের হাজারো শিশু, পরিবার, প্রশিক্ষক, দিনের পর দিন মহড়া ও স্বেচ্ছাসেবকের দীর্ঘ প্রস্তুতি।

শিশুদের উপস্থিতির একটি প্রতীকী তাৎপর্যও আছে। বিশ্বকাপের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, চাপ থাকে, কখনো উত্তেজনা ও বিরোধও থাকে। কিন্তু খেলোয়াড় যখন একটি শিশুর হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করেন, তখন দৃশ্যটি মনে করিয়ে দেয়, গ্যালারির ওপারে অসংখ্য ছোট চোখ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তারা শুধু তাঁর গোল উদ্‌যাপন শেখে না, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, রেফারির সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া এবং পরাজয়ের পর মাথা উঁচু রাখাও শেখে।

অনেক খেলোয়াড়ের কাছেও এই মুহূর্তটি আলাদা। বিশ্বকাপের ম্যাচের আগে তাঁদের মাথায় ঘুরতে থাকে কৌশল, দায়িত্ব এবং একটি দেশের প্রত্যাশা। কিন্তু এই তীব্র চাপের মধ্যে একটি শিশুর হাসি, কৌতূহলী প্রশ্ন কিংবা ছোট্ট হাতের স্পর্শ তাঁদের কয়েক মুহূর্তের জন্য শৈশবে ফিরিয়ে নিতে পারে। যে খেলোয়াড় আজ বিশ্বতারকা, তিনিও একদিন গ্যালারিতে বসে কারও খেলা দেখেছেন, কারও জার্সি পরে ঘুমিয়েছেন, কারও মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন।

বিশ্বকাপ তাই শুধু জয় ও পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি এমন এক উৎসব, যেখানে আজকের নায়ক আগামী দিনের স্বপ্নবাজের হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য একটি বড় হাতের সঙ্গে মিশে থাকে একটি ছোট্ট হাত। তারপর জাতীয় সংগীত শেষ হয়, বাঁশি বাজে, শিশুরা মাঠ ছেড়ে যায় এবং শুরু হয় জয়ের লড়াই। কিন্তু যে শিশুটি একজন বিশ্বতারকার পাশে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চ দেখেছে, সে শিশুটি বাড়ি ফেরে সারা জীবন বলে যাওয়ার মতো একটি গল্প নিয়ে।

তথ্যসূত্র: FIFA, UNICEF


Back to top button
🌐 Read in Your Language