সম্পাদকের পাতা

মাঠের বাইরে থাকা কোচকে কোন নিয়মে কার্ড দেখান রেফারি?

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের মাঠে কার্ড দেখলে সাধারণত চোখ চলে যায় খেলোয়াড়ের দিকে। কে ফাউল করল, কে প্রতিবাদ করল, কে সময় নষ্ট করল, কে শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়ল। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের বিচার শুধু সবুজ ঘাসের ভেতরে আটকে নেই। মাঠের এক পাশে ছোট একটি সীমারেখা টেনে রাখা থাকে, নাম তার টেকনিক্যাল এরিয়া। সেখানে দাঁড়িয়ে কোচ কখনো হাত নেড়ে নির্দেশ দেন, কখনো বদলি খেলোয়াড়কে প্রস্তুত করেন, কখনো হতাশায় মাথায় হাত দেন, কখনো আবার রেফারির সিদ্ধান্তে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ফুটবল বুঝে গেছে, ম্যাচের আগুন শুধু খেলোয়াড়ের পায়ে নয়; অনেক সময় তা ছড়িয়ে পড়ে টাচলাইন থেকেও। তাই মাঠে না খেললেও কোচ রেফারির শৃঙ্খলার বাইরে নন।

প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক। কোচ তো মাঠে খেলেন না, বল ছোঁয়েও দেখেন না, প্রতিপক্ষকে ট্যাকলও করেন না। তাহলে তাঁকে কার্ড দেখানোর নিয়ম কোথায়? উত্তরটি আছে ফুটবলের আইনের ভেতরে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আইএফএবি বা International Football Association Board-এর ‘Laws of the Game’-এ স্পষ্ট বলা আছে, হলুদ কার্ড সতর্কবার্তা এবং লাল কার্ড বহিষ্কারের সংকেত। এই কার্ড শুধু খেলোয়াড়ের জন্য নয়; খেলোয়াড়, বদলি খেলোয়াড়, পরিবর্তিত খেলোয়াড় এবং ‘team official’-কেও হলুদ বা লাল কার্ড দেখানো যায়। কোচ, সহকারী কোচ, গোলকিপিং কোচ, ফিটনেস কোচ, মেডিকেল স্টাফ, টিম ম্যানেজার সবাই এই ‘team official’-এর মধ্যে পড়েন। আইনে আরও বলা আছে, দলের বেঞ্চে বিশৃঙ্খলা হলে এবং অপরাধীকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা না গেলে, দায় গিয়ে পড়ে টেকনিক্যাল এরিয়ায় থাকা সিনিয়র কোচের ওপর।

কোচকে কার্ড দেখানোর প্রধান কারণ হলো আচরণ নিয়ন্ত্রণ। রেফারির সিদ্ধান্তে প্রকাশ্যে অতিরিক্ত প্রতিবাদ, আক্রমণাত্মক ভঙ্গি, প্রতিপক্ষের টেকনিক্যাল এরিয়ায় ঢুকে পড়া, খেলা পুনরায় শুরুতে বাধা দেওয়া, পানির বোতল বা কোনো বস্তু ছুড়ে ফেলা, ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করা কিংবা VAR রিভিউয়ের জন্য অযথা চাপ তৈরি করা, এসব কারণে কোচ হলুদ কার্ড দেখতে পারেন। আর অপমানজনক ভাষা ব্যবহার, সহিংস আচরণ, মাঠে ঢুকে খেলায় হস্তক্ষেপ বা ম্যাচ অফিসিয়ালের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে লাল কার্ডও আসতে পারে। আইএফএবির নিয়মে এমন উদাহরণও আছে, কোচ মাঠে ঢুকে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের খেলায় হস্তক্ষেপ করলে তাঁকে লাল কার্ড দেখিয়ে বহিষ্কার করা হবে এবং খেলা পুনরায় শুরু হবে নিয়ম অনুযায়ী ফ্রি-কিক বা পরিস্থিতি অনুযায়ী পেনাল্টি দিয়ে।

কার্ডের ইতিহাস অবশ্য আরও পুরনো। আজ ফুটবলে হলুদ আর লাল কার্ড এত স্বাভাবিক যে মনে হয় খেলার জন্মলগ্ন থেকেই এ ব্যবস্থা ছিল। বাস্তবে তা নয়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ক ও ভাষাগত বিভ্রান্তির পর ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন ভাবতে শুরু করেন, এমন একটি দৃশ্যমান সংকেত দরকার যা ভাষা না বুঝলেও সবাই বুঝবে। ট্রাফিক লাইটের ধারণা থেকেই ফুটবলে আসে হলুদ ও লাল কার্ড। হলুদ মানে সতর্ক হও, লাল মানে থামো, তুমি আর ম্যাচের অংশ নও। বিশ্বকাপে এই কার্ড ব্যবস্থার ব্যবহার শুরু হয় ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে। তখন কার্ড ছিল মূলত খেলোয়াড়ের শৃঙ্খলার ভাষা, কিন্তু সময়ের সঙ্গে ফুটবল বুঝতে পারে, শৃঙ্খলা শুধু মাঠের ভেতরের বিষয় নয়।

বিশ্বকাপে কোচ বহিষ্কারের প্রথম বড় ঘটনা ১৯৮৬ সালে। প্যারাগুয়ের কোচ কায়েতানো রে মেক্সিকোর টলুকায় বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে বারবার মাঠে ঢুকে পড়েন। ওই ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয় এবং প্যারাগুয়ে নকআউট পর্বে ওঠে। কিন্তু কায়েতানো রে ইতিহাসে থেকে যান অন্য কারণে। Guinness World Records-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনিই বিশ্বকাপ ম্যাচে বহিষ্কৃত প্রথম কোচ।

এরপর ফুটবল আরও বদলেছে। টিভি ক্যামেরা বেড়েছে, টাচলাইনের আচরণ বড় পর্দায় ধরা পড়তে শুরু করেছে, রেফারির সঙ্গে কোচদের তর্কও অনেক সময় ম্যাচের শৃঙ্খলাকে প্রভাবিত করেছে। আগে কোচকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হতো কিংবা সরাসরি ডাগআউট থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু দর্শক, খেলোয়াড় ও সংবাদমাধ্যম সব সময় বুঝতে পারত না, শাস্তিটি কী হলো। তাই কার্ড দেখানোর দৃশ্যমান ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ইংলিশ ফুটবলে ম্যানেজারদের হলুদ ও লাল কার্ড দেখানোর ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়, পরে ২০১৯-২০ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগেও তা কার্যকর হয়।

কোচকে কার্ড দেখানোর প্রয়োজন এখানেই। একজন কোচ শুধু কৌশলবিদ নন, তিনি দলের আচরণেরও নেতা। তাঁর অস্থিরতা বেঞ্চে ছড়িয়ে পড়ে, বেঞ্চের অস্থিরতা খেলোয়াড়ের শরীরী ভাষায় চলে আসে, আর সেখান থেকেই ম্যাচের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে। ফুটবলের মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকবে, থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবাদ আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি সীমারেখা আছে। সেই সীমারেখার নামই টেকনিক্যাল এরিয়া। কোচ সেখানে দাঁড়াতে পারেন, নির্দেশ দিতে পারেন, আবেগ দেখাতে পারেন; কিন্তু তিনি ম্যাচ পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের অসম্মান করতে পারেন না, খেলায় বাধা দিতে পারেন না, প্রতিপক্ষকে উসকানি দিতে পারেন না।

আধুনিক বিশ্বকাপে এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ দেখা যায় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ পাওলো বেন্তো ঘানার বিপক্ষে ৩-২ গোলে হারের পর শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে রেফারি অ্যান্থনি টেলরের দিকে গিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন। দক্ষিণ কোরিয়া তখন শেষ মুহূর্তে কর্নার পাওয়ার দাবি করছিল, কিন্তু রেফারি ম্যাচ শেষ করে দেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বেন্তো লাল কার্ড দেখেন এবং পরের ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে টাচলাইনে থাকতে পারেননি।

২০২৬ বিশ্বকাপেও বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। কারণ এবারের আসরে ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ এবং তিন আয়োজক দেশ মিলিয়ে চাপ ও নজরদারি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। রেফারিরা শুধু খেলোয়াড়ের ফাউল দেখছেন না, বেঞ্চের আচরণও নজরে রাখছেন। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে গ্রুপ পর্বের ৭২ ম্যাচ শেষে জানান, রেফারির সিদ্ধান্তে আপত্তির কারণে খেলোয়াড়দের দুবার এবং কোচদেরও দুবার সতর্ক করা হয়েছে। তার পরদিনই, ১ জুলাই ২০২৬, সিয়াটল স্টেডিয়ামে রাউন্ড অব ৩২-এর বেলজিয়াম-সেনেগাল ম্যাচে বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়াকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি সাইদ মার্তিনেজ। Reuters-এর ছবিতেও মুহূর্তটি ধরা আছে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের উদাহরণটি আরও স্পষ্ট করে দেখায়, টাচলাইনের আচরণ এখন সরাসরি রেফারির শৃঙ্খলার আওতায়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। কোচ লাল কার্ড দেখলে তাঁর দল মাঠে দশ জনে নেমে যায় না। কারণ তিনি খেলোয়াড় নন। কিন্তু শাস্তি কম নয়। তাঁকে টেকনিক্যাল এরিয়া ছাড়তে হয়, ডাগআউট থেকে নির্দেশ দিতে পারেন না, অনেক সময় পরের ম্যাচেও নিষেধাজ্ঞা আসে। বড় ম্যাচে কোচের অনুপস্থিতি দলের কৌশল, বদলি সিদ্ধান্ত, মানসিক শক্তি, সবকিছুতেই প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোচের লাল কার্ড শুধু ব্যক্তিগত শাস্তি নয়; বড় ম্যাচে এটি পুরো দলের পরিকল্পনাকেই নড়বড়ে করে দিতে পারে।

ফুটবলের সৌন্দর্য আবেগে, কিন্তু ফুটবলের অস্তিত্ব শৃঙ্খলায়। কোচের চোখে আগুন থাকতে পারে, কণ্ঠে তাগিদ থাকতে পারে, হাতের ইশারায় কৌশল থাকতে পারে। কিন্তু আইন সবার ওপরে। মাঠে বল পায়ে খেলোয়াড় যেমন নিয়মের অধীন, মাঠের বাইরে দাঁড়ানো কোচও তেমনি নিয়মের অধীন। তাই রেফারি যখন কোচকে কার্ড দেখান, সেটি শুধু একজন মানুষকে সতর্ক করা নয়; সেটি মনে করিয়ে দেওয়া, খেলার বাইরে দাঁড়িয়েও কেউ খেলার আইনের বাইরে নন।

তথ্যসূত্র: FIFA Inside, Sky Sports; Reuters


Back to top button
🌐 Read in Your Language