সম্পাদকের পাতা

সমুদ্রের ছোট দেশ, বিশ্বকাপের বড় স্বপ্ন

নজরুল মিন্টো

আটলান্টিকের নীল জলরাশির বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি দ্বীপ। মানচিত্রে খুঁজতে গেলে চোখে প্রথমে ধরা পড়ে না। সেই দ্বীপদেশই এবার বিশ্বকাপের মাঠে দাঁড়িয়ে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মতো দলের সামনে বুক চিতিয়ে বলেছে, আমরা এসেছি শুধু খেলতে নয়, নিজেদের পরিচয় জানাতে। এখন সেই পরিচয়ের গল্প আরও বড় হয়েছে। কারণ কেপ ভার্দে আর শুধু বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নতুন অতিথি নয়, তারা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা এক বিস্ময়কর নাম।

দেশটির সরকারি নাম কাবো ভার্দে। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা দশটি দ্বীপের দেশ এটি। জনসংখ্যা পাঁচ লাখের কিছু বেশি। আয়তনে ছোট, সম্পদে সীমিত, কিন্তু স্বপ্নে নয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাদের উপস্থিতি তাই শুধু একটি দলের সাফল্য নয়; এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ। যে দেশকে অনেকেই এতদিন চিনত সমুদ্রযাত্রা, অভিবাসন আর সঙ্গীতের ইতিহাসে, সেই দেশকে এবার পৃথিবী চিনছে ফুটবলের সবুজ মাঠে।

এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের গল্প শুরু হয়েছিল বিস্ময় দিয়ে, আর গ্রুপ পর্ব শেষে তা রূপ নিয়েছে রূপকথায়। গ্রুপ এইচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরব। স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, উরুগুয়ে ফুটবল ইতিহাসের প্রাচীনতম মহাশক্তিগুলোর একটি, সৌদি আরবও বিশ্বকাপের অভিজ্ঞ দল। সেই গ্রুপে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ওঠা কেপ ভার্দে যেন ছোট নৌকা নিয়ে নেমেছিল সমুদ্রযুদ্ধে। কিন্তু ফুটবলে কখনও কখনও ছোট নৌকাও বিশাল জাহাজের সামনে রুখে দাঁড়ায়।

প্রথম ম্যাচেই তারা স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয়। স্পেনের মতো দল আক্রমণের পর আক্রমণ করেও গোল পায়নি। কেপ ভার্দের রক্ষণ, গোলরক্ষক ভোজিনহার অভিজ্ঞতা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা সেই ম্যাচকে বিশ্বকাপের প্রথম বড় চমকগুলোর একটি করে তোলে। অনেক বড় দল যে বিশ্বকাপে ভয় পায় স্পেনের বল দখল, পাসের গতি আর আক্রমণের ধারকে, সেই স্পেনের সামনে কেপ ভার্দে মাথা নত করেনি। তারা যেন পৃথিবীকে প্রথম ম্যাচেই জানিয়ে দেয়, ছোট দেশেরও মেরুদণ্ড থাকে।

এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষেও কেপ ভার্দে থেমে থাকেনি। ২-২ ড্রয়ে তারা আবারও দেখিয়েছে, তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা কেবল অংশগ্রহণের সৌজন্য অধ্যায় নয়। কেভিন পিনার ফ্রি-কিকে কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোল পায়। গোলটি শুধু স্কোরবোর্ডে একটি সংখ্যা ছিল না; সেটি ছিল একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম স্বাক্ষর। পরে হেলিও ভারেলার গোলে তারা ম্যাচে ফিরে আসে। উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে না পড়ে, বরং লড়াইয়ে থেকে ফল আদায় করে নেওয়া কেপ ভার্দের জন্য ছিল আত্মবিশ্বাসের নতুন ভাষা।

শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র তাদের গল্পকে আরও উঁচুতে তুলে নেয়। তিন ম্যাচে তিন ড্র, কোনো ম্যাচে পরাজয় নেই। স্পেন গ্রুপের শীর্ষে ওঠে, আর কেপ ভার্দে দ্বিতীয় হয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশে। উরুগুয়ে ও সৌদি আরব বিদায় নেয়। এই ফলের মধ্য দিয়ে কেপ ভার্দে শুধু নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই নকআউট পর্বে ওঠেনি, তারা হয়ে উঠেছে এই আসরের সবচেয়ে আলোচিত বিস্ময়গুলোর একটি।

এই কারণেই কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তার কথাগুলো আলাদা গুরুত্ব পায়। তাঁর কাছে বিশ্বকাপ মানে শুধু পাস, শট, গোল কিংবা পয়েন্ট টেবিল নয়। তিনি বলেছেন, তারা গোটা বিশ্বের সামনে নিজেদের দেশকে তুলে ধরতে চান। তাদের সংস্কৃতি, সঙ্গীত ও ইতিহাস মানুষকে জানাতে চান। তাঁর এই ভাবনা কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ যাত্রাকে ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে সংস্কৃতির গল্পে পরিণত করে।

কেপ ভার্দের সেই পরিচয়ের ভেতরে আছে সমুদ্র, অভিবাসন, সংগ্রাম, সঙ্গীত আর এক ধরনের বিষণ্ন সৌন্দর্য। দেশটির মরনা সঙ্গীত ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। সিজারিয়া এভোরা এই সঙ্গীতকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন ফুটবল দল যেন অন্য ভাষায় সেই কাজটাই করছে। আগে গান দিয়ে কেপ ভার্দেকে চিনেছে পৃথিবী, এবার ফুটবল দিয়ে চিনছে।

কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের অনেকেই ইউরোপের নানা লিগে ছড়িয়ে আছেন। কেউ জন্মেছেন দ্বীপের মাটিতে, কেউ বড় হয়েছেন দূরদেশের আলো-হাওয়ায়। কারও কাছে কেপ ভার্দে বাবার গল্প, মায়ের গান, পূর্বপুরুষের জন্মভূমি। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপালেই তারা এক পতাকার নিচে এসে দাঁড়ান। এই জায়গাতেই কেপ ভার্দের গল্প আরও গভীর। ছোট দেশগুলোর শক্তি অনেক সময় অর্থে নয়, ছড়িয়ে থাকা মানুষের আবেগে।

এই দলটির আরেক প্রতীক চল্লিশ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে যেখানে তারুণ্য, গতি আর তারকার ঝলক বেশি আলো পায়, সেখানে ভোজিনহার স্থিরতা কেপ ভার্দের গল্পে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। স্পেনের বিপক্ষে তাঁর দৃঢ়তা, সৌদি আরবের বিপক্ষে তাঁর ক্লিন শিট, সতীর্থদের ওপর তাঁর প্রভাব, সব মিলিয়ে তিনি যেন এই সমুদ্রদেশের অভিজ্ঞ নাবিক। ঝড় যত বড়ই হোক, গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কেপ ভার্দেকে ডুবতে দেননি।

এখন সামনে আর্জেন্টিনা। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শক্তির বিচারে ব্যবধান অনেক। কিন্তু কেপ ভার্দে ইতিমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে হিসাবের বাইরেও একটি জায়গা থাকে, যার নাম বিশ্বাস। স্পেনকে আটকে দেওয়া, উরুগুয়ের সঙ্গে লড়াই করে ফেরা, সৌদি আরবের বিপক্ষে ফল ধরে রাখা, এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সামনে। এই ম্যাচে কেপ ভার্দে জিতুক বা হারুক, তারা ইতিমধ্যে নিজেদের ইতিহাস লিখে ফেলেছে।

কেপ ভার্দে হয়তো বিশ্বকাপ জিততে আসেনি। কিন্তু তারা এমন এক গল্প লিখতে এসেছে, যা বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও থেকে যাবে। কারণ ফুটবলে সব জয় ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। একটি ড্রও কখনও একটি দেশের ইতিহাসে বিজয়ের মতো আলো ছড়ায়। নকআউটে ওঠাই হয়ে যায় প্রজন্মের স্মৃতি। আটলান্টিকের ছোট দ্বীপদেশটি তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, মানচিত্রে ছোট হওয়া আর স্বপ্নে ছোট হওয়া এক কথা নয়।

তথ্যসূত্র: Reuters; FIFA; Al Jazeera


Back to top button
🌐 Read in Your Language