আইন-আদালত

এমপি আনার হত্যা মামলার মূল ঘাতক শিমুল ভূঁইয়ার জামিন, হাইকোর্টের আদেশে তীব্র চাঞ্চল্য!

ঢাকা, ৮ জুন – ২০২৪ সালের বহুল আলোচিত ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড—কলকাতায় ঝিনাইদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে খুন করে টুকরো টুকরো করার মামলার অন্যতম প্রধান আসামি শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লা সাঈদ জামিন পেয়েছেন।

আজ সোমবার (৮ জুন) দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ শুনানি শেষে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করে রুল জারি করেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়া একজন হাই-প্রোফাইল আসামির জামিনের এই খবরে দেশের রাজনৈতিক ও আইনি মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের দুই বছরের মাথায় আদালতের এই বড় আদেশ এবং বিগত দিনে হওয়া এই হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ব্যাকগ্রাউন্ড নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

যেভাবে কলকাতায় খুন হন এমপি আনার

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের মে মাসে। ওই বছরের ১৩ মে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতের কলকাতায় গিয়ে নিখোঁজ হন তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। পরবর্তীতে জানা যায়, কলকাতার নিউ টাউন এলাকার সঞ্জীবা গার্ডেনসের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। শুধু হত্যাই নয়, লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে কসাই এনে তার মরদেহ টুকরো টুকরো (চামড়া ও মাংস আলাদা) করে বিভিন্ন ট্রলিব্যাগে ভরে কলকাতার বিভিন্ন জলাশয় ও খালের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল—যা তৎকালীন সময়ে পুরো ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এই নৃশংস ঘটনার পর, ২০২৪ সালের ২২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপহরণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেন এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।

হত্যাকাণ্ডের প্রধান ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঢাকায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন যে, ভারতীয় পুলিশের দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তিনজনকে গ্রেফতার করে।

এই তিনজন হলেন:
১. আমানুল্লা সাঈদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া (এক সময়কার শীর্ষ চরমপন্থী নেতা)
২. তানভীর ভূঁইয়া
৩. সেলেস্টি রহমান

গ্রেফতারের পর, ২০২৪ সালের ৫ জুন ঢাকার আদালতে হাজির করা হলে শিমুল ভূঁইয়া স্বেচ্ছায় দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের দোষ স্বীকার করে এক রোমাঞ্চকর ও লোমহর্ষক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি কীভাবে এমপি আনারকে ট্র্যাপে ফেলে হত্যা করা হয় এবং লাশের মাংসের টুকরোগুলো কীভাবে বিলীন করা হয়, তার সব খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন।

হাইকোর্টের আজকের আদেশ ও মামলার বর্তমান অবস্থা

কারাগারে দীর্ঘ দুই বছর থাকার পর শিমুল ভূঁইয়ার আইনজীবীরা হাইকোর্টে জামিনের আবেদন জানান। আজ সোমবার হাইকোর্টের বেঞ্চ আবেদনটি মঞ্জুর করে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন এবং তাকে কেন স্থায়ী জামিন দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। তবে এই জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার জজ আদালতে আপিল করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মামলার মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত ঝিনাইদহের নেপাল কুমার ও সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটের প্রধান আখতারুজ্জামান শাহীন এখনো পলাতক রয়েছেন।

এমপি আনারের মতো একজন আইন প্রণেতাকে যেভাবে বিদেশের মাটিতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং যার লাশ আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, সেই মামলার প্রধান ঘাতক ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া আসামির এভাবে জামিন পাওয়াটা সাধারণ মানুষের মনে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এই আদেশের পর নিহত এমপি আনারের মেয়ে ডরিনের বিচার পাওয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

এনএন/ ৮ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language