সংসদে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারায় জ্বালানি মন্ত্রীকে স্পিকারের সতর্কবার্তা

ঢাকা, ৭ জুন – সংসদে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দিন বোধহয় এবার শেষ হতে চলল! সরকারের হেভিওয়েট মন্ত্রীদেরও যে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে, আজ তারই এক নজিরবিহীন দৃশ্য দেখল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। সংসদে দেওয়া কথা রাখতে না পারায় স্বয়ং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে যেন আনুষঙ্গিক সব বিষয় ভালোভাবে ‘স্টাডি’ বা পর্যালোচনা করে নেওয়া হয়।
আজ রোববার (৭ জুন) বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই আশুগঞ্জ সার কারখানায় (ফার্টিলাইজার) গ্যাস সরবরাহ নিয়ে এক তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় এই নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঘটনার সূত্রপাত বিএনপি নেত্রী ও সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার একটি সম্পূরক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। ফ্লোর নিয়ে রুমিন ফারহানা সরাসরি বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দিকে আঙুল তুলে ওনার পুরোনো একটি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
উত্তেজিত কণ্ঠে রুমিন ফারহানা বলেন, “মন্ত্রী এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, পহেলা মে-র মধ্যে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হবে। এরপর আরও এক মাস তিন-চার দিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারে আমরা গ্যাসের সাপ্লাই পাইনি!”
তিনি মন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট জবাব চান, ঠিক কবে নাগাদ এই সার কারখানায় গ্যাস দেওয়া হবে?
রুমিন ফারহানার এমন সাঁড়াশি প্রশ্নের মুখে পড়ে কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে দেশের গ্যাসের তীব্র সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি মূলত সার কারখানার চেয়ে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখাকেই এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে জানান।
পাল্টা যুক্তি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “তিনি (রুমিন ফারহানা) বিদ্যুৎও চাচ্ছেন, আবার ওনার ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিতেও গ্যাস চাচ্ছেন। গ্যাসের তো একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো চালিয়ে রাখার কারণেই ওনার ওখানে আমরা সংযোগ দিতে পারছি না।”
একই সাথে বিগত সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী দাবি করেন, “গত ১৭ বছরে কোনোদিন ড্রিলিং (খনন) করা হয়নি। আমরা এই প্রথম এসে ড্রিলিং শুরু করেছি এবং আশা করি, ইনশাআল্লাহ আমরা গ্যাস পাবো। গ্যাস পাওয়ার পরেই কেবল আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারের মতো কারখানায় আমরা সংযোগ দিতে পারবো।”
মন্ত্রীর এই অজুহাত কিন্তু একদমই ধোপে টেকেনি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে। মন্ত্রী বক্তব্য শেষ করার পরপরই স্পিকার স্বয়ং আসরে নামেন এবং মন্ত্রীকে ওনার পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে এক প্রকার ভর্ৎসনা করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরাসরি মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মন্ত্রী, আপনি কিন্তু সংসদে বলেছিলেন এক তারিখ থেকে গ্যাস যাবে। সেটি বোধহয় পাওয়া যায়নি।”
ভবিষ্যতে সংসদে যেকোনো বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার কড়া পরামর্শ দেন, “সংসদে যে প্রতিশ্রুতি দেবেন, সেটা ড্রিলিং বা অন্যান্য যাবতীয় আনুষঙ্গিক বিষয় স্টাডি (পর্যালোচনা) করে, তারপরে সংসদে দেবেন।”
সংসদের প্রথম দিনেই স্পিকারের এই কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, স্পিকারের এই ‘ওয়ার্নিং’-এর পর আশুগঞ্জ সার কারখানার ভাগ্য ফেরে কি না!
এনএন/ ৭ জুন ২০২৬









