সীমান্তে টানটান উত্তেজনা, সর্বোচ্চ অ্যালার্টে বিজিবি! ১০টি ‘পুশইন’ অপচেষ্টা রুখে দিল বাংলাদেশ

ঢাকা, ৪ জুন – দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় হঠাৎ করেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও পুলিশের পক্ষ থেকে পুশইনের (অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ করার) হিড়িক পড়েছে। তবে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং স্থানীয় জাগ্রত জনতার তীব্র প্রতিরোধের মুখে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে ভারতের এমন অন্তত ১০টি বড় ধরনের পুশইনের অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারির পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি ও বিজিবির টহল কয়েক গুণ জোরদার করা হয়েছে।
বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের পুশইনের ধরন ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও সুপরিকল্পিত।
চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কী ঘটেছিল সীমান্তগুলোতে:
ঝিনাইদহ (মহেশপুর সীমান্ত): মহেশপুরের বিওপি এলাকায় বিএসএফের একটি প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় ৩০-৩৫ জন ব্যক্তিকে সীমান্ত গেট খুলে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি টহলদল এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে লাঠিসোঁটা নিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভ্যানে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এর বাইরে যাদবপুর সীমান্ত দিয়ে ৪-৫ জনের আরেকটি দলকে পুশইনের চেষ্টা রুখে দেয় ৫৮ বিজিবি।
যশোর (গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত): ২১ বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সীমান্তে পুশইনের উদ্দেশ্যে অবস্থান নেওয়া একদল নারী-পুরুষকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
জয়পুরহাট (কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্ত): ভারতের অভ্যন্তরে ১০ জন ব্যক্তিকে জড়ো করে বাংলাদেশে পুশইনের গোপন খবর পেয়ে ২০ বিজিবি গোয়েন্দা নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ালে ভারতের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
বিজিবির বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের ভেতরের কিছু চাঞ্চল্যকর গোপন ডেরার তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে মুসলিম ও বাংলাদেশি নাগরিকদের পুশইনের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সোনামসজিদ সীমান্ত: ভারতের ৫৩ বিজিবি সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফ ক্যাম্পের নিকটবর্তী ৩টি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ এনআরসি/এসআইআর তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪ জন মুসলিম নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের মালদা জেলার ইংলিশ বাজার থানার চন্দনপার্কে ভারতীয় পুলিশের তৈরি আরেকটি হোল্ডিং সেন্টারে আটক ২২ জনকে পুশইনের লক্ষ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের খবর পেয়েছে ৫৯ বিজিবি। দুই এলাকাতেই কড়া পাহারা বসাচ্ছে বাংলাদেশ।
নেত্রকোনা (কচুগড়া সীমান্ত): ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানার বলিশী গীতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫-২০ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করে রাখা হয়েছে। সীমান্তের এই অংশে প্রাকৃতিক কারণে কোনো কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় বিজিবি এখানে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় (হাই অ্যালার্ট) রয়েছে।
রওশনপুর ও সিলেটে আটক ভারতীয়দের পুশব্যাক
পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক এক ব্যক্তিকে পুশইন করা হলে স্থানীয় জনগণ তাকে হাতেনাতে আটকে বিজিবিকে দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়। একই ঘটনা ঘটেছে সিলেটের ৪৮ বিজিবির উৎমাছড়া সীমান্তে। সেখানে স্থানীয়দের হাতে আটক সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তি যাচাই-বাছাই শেষে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় তাদের কঠোরভাবে ভারতে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে।
এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সীমান্তের বিপরীতে ২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে বিএসএফ আটক করে নিজেদের হেফাজতে রাখলেও, এখন পর্যন্ত বিজিবির সাথে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করেনি।
বিজিবি তাদের বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতের এই অবৈধ পুশইনের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। বিজিবি জানায়, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থি যে-কোনো পুশইন বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং যে-কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এনএন/ ৪ জুন ২০২৬









