মধ্যপ্রাচ্য

গাজায় ছড়াচ্ছে ইঁদুর ও পরজীবীজনিত চর্মরোগ: আক্রান্ত সোয়া লাখ মানুষ, ধ্বংসস্তূপে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট

জেরুজালেম, ২২ মে – যুদ্ধবিদ্ধস্ত গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের বোমাবর্ষণ আর অবরোধের পর এবার নেমে এসেছে এক নতুন ও চরম অমানবিক বিপর্যয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার কারণে সেখানে এখন মহামারি আকারে ছড়াচ্ছে ইঁদুর ও বিপজ্জনক পরজীবীজনিত চর্মরোগ (Skin Infections)। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) গাজায় ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি এই মারাত্মক চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA) এই শিউরে ওঠার মতো তথ্য প্রকাশ করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি পোস্টে ইউএনআরডব্লিউএ জানায়, গাজা উপত্যকায় চলমান অন্যান্য মানবিক সংকটের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে এই ভয়াবহ চর্মরোগ। তীব্র আবর্জনা, চারপাশের ধ্বংসস্তূপ এবং ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ার কারণে এই পরজীবী সংক্রমণ অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে সাধারণ মানুষের ত্বকে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু ও অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

সংস্থাটি আরও জানায়, “আমাদের শত শত সাহসী চিকিৎসাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ জন করে চর্মরোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের হাত বাঁধা। গাজায় যদি পর্যাপ্ত ওষুধ এবং চিকিৎসার সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত, তবে আমরা আরও অনেক বেশি মানুষকে এই তীব্র যন্ত্রণা থেকে সেবা দিতে পারতাম।”

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের অক্টোবরে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষিত হলেও উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও হামলা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২,৬০২ জন আহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও গাজায় প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা, খাদ্য ও জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ প্রবেশে এখনো প্রতিনিয়ত বাধা দিয়ে যাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল। ফলে অবরুদ্ধ গাজাবাসী রোগ নিরাময়ের ন্যূনতম ওষুধটুকুও পাচ্ছেন না।

ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবন, পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বর্বর সামরিক অভিযানে গাজা আজ এক জীবন্ত কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের সিংহভাগই নিষ্পাপ শিশু ও নারী। গাজার বিভিন্ন শহর ও শরণার্থী শিবিরের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত ৮ হাজার মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে আছে, যা উদ্ধার করার মতো কোনো যন্ত্রপাতি বা জ্বালানি গাজায় নেই।

বাস্তুচ্যুত ১৫ লাখ মানুষ: বাড়িঘর হারিয়ে বর্তমানে ১৫ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি খোলা আকাশের নিচে বা প্লাস্টিকের তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, যেখানে কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। আর এই নোংরা পরিবেশই ইঁদুর ও পরজীবী ছড়ানোর মূল কারখানায় পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, গাজায় যদি এখনই বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়, তবে এই চর্মরোগের মহামারি লাখ লাখ মানুষের জীবনকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।

গাজায় যুদ্ধবিরতির পরেও এই মানবিক অবরোধ ও ওষুধের সংকট নিয়ে আপনার মতামত কী? ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তুলতে প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন।

এনএন/২২ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language