জাতীয়

সংবিধান ও আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে প্রশাসক দিয়ে চলছে স্থানীয় সরকার

ঢাকা, ১৩ মে – বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের মালিক হলো এ দেশের সাধারণ জনগণ। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এর আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা। বিশেষ করে সরকারের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা সংবিধানের একটি মূল চেতনা।

সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপরই স্থানীয় শাসনের ভার থাকবে। এই বিধান অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও কুদরত ই ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলায় রায় দিয়েছে যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এলাকা ব্যবস্থাপনা।

বর্তমানে দেশে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যেখানে প্রায় সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অনির্বাচিত প্রশাসক বা মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এটি সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৯১ সালে আদালত সব স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিল।

আপিল বিভাগের সেই ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছিল যে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও তা হবে খুবই স্বল্প সময়ের জন্য এবং তারা কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। অথচ বর্তমানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় পরিষদে নিয়োজিত প্রশাসকরা রুটিন কাজের বাইরে বড় ধরণের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যা আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান চালানো হলে সেগুলোকে সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার হিসেবে গণ্য করা যায় না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত আইনগুলোতে সংশোধনী এনে জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত ও প্রশাসক নিয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে তুলে দেয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৭ আগস্ট চারটি পৃথক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা তদন্ত ছাড়াই জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের পথ খুলে দেয়।

বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক এই আইনকে সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী এবং কেন্দ্রীয় সরকারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশগুলোকে সংসদে পাস করেছে এবং দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। এটি বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ৩১ দফার সাথেও সাংঘর্ষিক যেখানে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত করার কথা বলা হয়েছিল।

বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। এছাড়া ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ৩৩০টি পৌরসভাও চলছে খণ্ডকালীন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র থাকলেও সেখানে কোনো কাউন্সিলর নেই। আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচনের ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘ সময় জনপ্রতিনিধিহীন থাকায় নাগরিকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকারও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

এস এম/ ১৩ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language