সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর নির্মম হত্যাকাণ্ড

নজরুল মিন্টো

ফ্লোরিডার ট্যাম্পা শহর সাধারণত উপকূলীয় জলরেখা, উন্মুক্ত আকাশ আর বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তারুণ্যের জন্য পরিচিত। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ক্যাম্পাসে প্রতিদিনই মিশে থাকে গবেষণার ব্যস্ততা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন। কিন্তু এপ্রিলের শেষভাগে সেই পরিচিত পরিবেশের ওপর নেমে আসে শোক, আতঙ্ক এবং অমীমাংসিত প্রশ্নের ছায়া। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে আসা দুই তরুণ গবেষক, জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি, হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার পর যে সত্য সামনে আসতে শুরু করে, তা কেবল দুটি জীবনের করুণ সমাপ্তি নয়; এটি আস্থা, নিরাপত্তা এবং পরিচিত সম্পর্কের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের এক ভয়াবহ দলিল।

জামিল আহমেদ লিমন ছিলেন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি গবেষক। পরিবেশ, জলবায়ু এবং মানুষের বসবাসযোগ্য পৃথিবী নিয়ে তাঁর একাডেমিক আগ্রহ ছিল গভীর। অন্যদিকে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। দুজনের বয়সই ছিল ২৭। তাঁরা শুধু সহপাঠী বা পরিচিত মুখ ছিলেন না, একসঙ্গে জীবন শুরু করার পরিকল্পনাও করছিলেন। পিএইচডি শেষ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। জামিলের দেশের বাড়ি বাংলাদেশের জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলায়, আর নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর এলাকায়।

১৬ এপ্রিল তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার, বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। ফোন বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, পরিচিত জায়গায় অনুপস্থিতি, সব মিলিয়ে বিষয়টি শুরু থেকেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। প্রথমে এটি ছিল নিখোঁজের ঘটনা। কিন্তু দিন যত গড়ায়, আশঙ্কা তত গভীর হয়।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে ২৬ বছর বয়সী হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়েহ। তিনি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, লিমনের রুমমেট ছিলেন। একই ছাদের নিচে বসবাস মানে দৈনন্দিন জীবনের একটি অনিবার্য আস্থা। কিন্তু পুলিশি তদন্তে সেই সম্পর্কই এখন সবচেয়ে গুরুতর সন্দেহের জায়গা।

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়েহের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আরও রয়েছে শারীরিক আঘাত, জোরপূর্বক আটকে রাখা, প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা, মৃত্যুর কথা গোপন করা এবং মৃতদেহ অবৈধভাবে সরানোর মতো গুরুতর অভিযোগ।

হিশাম ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সাবেক শিক্ষার্থী। জানা গেছে, তিনি ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, গ্রেপ্তারের আগে তিনি নিজের পারিবারিক বাড়িতে অবস্থান নেন। পরে সোয়াট টিম এবং ক্রাইসিস নেগোশিয়েটরদের সহায়তায় তাঁকে আটক করা হয়।

জামিল লিমনের মরদেহ হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় উদ্ধার করা হয়। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুও নিশ্চিত করা হয়। তবে তাঁর মরদেহ সম্পূর্ণভাবে উদ্ধার করা যাবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ব্রিজ ও আশপাশের জলসীমায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। হত্যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

সহপাঠী ও পরিচিতজনদের কাছে জামিল ও বৃষ্টি ছিলেন প্রাণোচ্ছল, পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল। নাহিদা বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত যখন তাঁর বোনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন, তখন সেই বেদনা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পরিবারের কান্না, বন্ধুদের স্মৃতি এবং অভিবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে এই ঘটনাকে ব্যক্তিগত শোকের বাইরে নিয়ে যায়।

ট্যাম্পার আকাশের নিচে এখন দুটি অসমাপ্ত জীবনের প্রশ্ন ভাসছে। জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি এসেছিলেন জ্ঞান অর্জনের জন্য, গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার জন্য, একটি নতুন জীবন গড়ার আশায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ গভীর শোকের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারই এখন সবার প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র:
AP News (২৫ এপ্রিল ২০২৬)
Fox 13 News Tampa Bay (২৫ এপ্রিল ২০২৬)
WTSP 10 Tampa Bay (২৫ এপ্রিল ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language