পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ বহু মুসলিম, হেনস্তার আশঙ্কায় পরিযায়ী শ্রমিকরা

কলকাতা, ২২ এপ্রিল – পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মুসলিম ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এর ফলে রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী তকমা পাওয়ার এবং হেনস্তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মুর্শিদাবাদ জেলার ভগবানগোলার বাসিন্দা আওয়াল শেখ এই পরিস্থিতির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এসআইআরের দ্বিতীয় দফায় তার নাম বিবেচনাধীন থাকার পর শেষমেশ ভোটার তালিকায় উঠলেও, নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করার আগে তাকে তামিলনাড়ুর একটি ডিটেনশন সেন্টারে প্রায় এক বছর আটক থাকতে হয়েছিল। মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে ভারতীয় প্রমাণিত হয়ে তিনি সম্প্রতি বাড়ি ফিরেছেন।
একই জেলার লালগোলা বিধানসভা এলাকার দেবীপুরের বাসিন্দা হালিম শেখকেও গত বছর উড়িষ্যা পুলিশ বাংলাদেশি সন্দেহে ছয় দিন আটকে রেখেছিল। পরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ নথি যাচাই করে তাকে মুক্ত করলেও তার নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি।
অন্যদিকে আখতার আলী পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক এবং ভোটের প্রিজাইডিং অফিসার হওয়া সত্ত্বেও ভোটার তালিকা থেকে তার নিজের নামই বাদ পড়েছে।
সবর ইনস্টিটিউট নামে একটি সমাজ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ, লালগোলা এবং ভগবানগোলার মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষক সাবির আহমেদ জানান, নির্বাচন কমিশন নামের বানানে সামান্য ভুল বা বিবাহিত নারীদের পদবি বদলের মতো বিষয়গুলোকেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতি হিসেবে ধরে নিয়ে লাখ লাখ নাম বাতিল করেছে। শুধুমাত্র সামশেরগঞ্জেই ৮৩ হাজারেরও বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলা থেকে প্রচুর মানুষ জীবিকার সন্ধানে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান।
অভিযোগ রয়েছে, মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা সন্দেহে বিভিন্ন রাজ্যে হেনস্তা করা হচ্ছে। কারগিল যুদ্ধে অংশ নেওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য দাউদ আলির মতো ব্যক্তির নামও উপযুক্ত নথি থাকা সত্ত্বেও তালিকা থেকে বাদ গেছে, যা নিয়ে তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।
পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া শুধুমাত্র ভোটাধিকার হারানো নয়, বরং এটি নাগরিকত্বের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে। ভোটার কার্ড বাতিল হয়ে যাওয়ায় অনেককে কর্মস্থলে নতুন করে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ভোট তাদের কাছে উৎসবের মতো থাকলেও এবার নাম বাদ পড়ার কারণে এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবুও যাদের নাম তালিকায় রয়েছে, তারা অধিকার রক্ষার্থে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে নাম নিষ্পত্তির জন্য অনেকেই এখন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
এনএন/ ২২ এপ্রিল ২০২৬









