
টরন্টো এখন যেন এক দীর্ঘ নির্বাচনী ঋতুর ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। শীতের মৌসুমে যে রাজনৈতিক উত্তাপ শুরু হয়েছিল, তা এখনও থামেনি। বরং এক নির্বাচনের পর আরেক নির্বাচনের প্রস্তুতি বাংলাদেশি কমিউনিটিকে নতুন করে আলোচনায়, প্রত্যাশায় এবং অংশগ্রহণের আনন্দে সরব করে তুলেছে। সদ্য সমাপ্ত কানাডার ফেডারেল নির্বাচন ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রবাসী বাঙালিদের জন্য ছিল আবেগ, গর্ব ও আশার এক বিশেষ অধ্যায়। সারা বিশ্বের বাঙালিদের দৃষ্টি ছিল সেই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সম্মিলিত শুভকামনার শেষে ডলি বেগমের বিজয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
এই সাফল্যের আবহ কাটতে না কাটতেই সামনে আসছে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। জানা যাচ্ছে, এ নির্বাচনেও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রার্থী বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এর ফলে কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির অংশগ্রহণ আরও দৃশ্যমান হতে চলেছে। একই সময়ে কমিউনিটির ভেতরেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। কানাডার বাংলাদেশ কমিউনিটির অন্যতম বৃহৎ সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে ১৭ মে ২০২৬। ভোটার হওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ এপ্রিল ২০২৬। ভোটার তালিকা এখনও চূড়ান্ত না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১০ হাজার ভোটার এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। ফলে এবারের নির্বাচন যে জমজমাট হবে, তা এখনই আন্দাজ করা যাচ্ছে।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন শুধু একটি আঞ্চলিক সংগঠন নয়, দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রবাসে শিকড়ের টান, আত্মীয়তার বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামাজিক পরিচয়ের যে মেলবন্ধন তৈরি হয়, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্র। তাই এ সংগঠনের নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এবারের নির্বাচনে তিনটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ইতিমধ্যে প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেছেন। টরন্টোর বিভিন্ন দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি আড্ডাস্থলে শোভা পাচ্ছে তাঁদের পোস্টার। এরি মধ্যে শুরু হয়েছে প্যানেল পরিচিতি সভাও।
গত ২০ এপ্রিল সোমবার রনি, রাসেল ও মারুফ পরিষদের পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিকবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতিতে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ঘোষণা করেন। সভায় প্রার্থীরা নিজেদের পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অবস্থান এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অতীত ভূমিকা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানটি ছিল প্রাণবন্ত, সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয়। উপস্থিত অতিথিরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন এবং প্রার্থীরা সেসব প্রশ্নের সুচিন্তিত জবাব দেন।
এই আয়োজনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক ছিল কমিউনিটির বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের সংযত ও দায়িত্বশীল বক্তব্য। তাঁরা জোর দিয়ে বলেন, “নির্বাচন আসবে, নির্বাচন যাবে, কিন্তু দিন শেষে আমরা আমরাই।” প্রতিটি প্যানেলের প্রার্থীদের প্রতি তাঁদের আহ্বান ছিল, নির্বাচনী প্রচারণায় যেন কেউ অশালীন আচরণ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে এমন কোনো ভাষা ব্যবহার না করেন।
তাঁরা আরও স্মরণ করিয়ে দেন, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা একে অন্যের আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষী। এই সংগঠন একটি বড় পরিবারের মতো। ভোটাররা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। যারা নির্বাচিত হবেন, তাঁরা আগামী তিন বছরের জন্য সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন এবং সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবেন। তাই প্রতিযোগিতা থাকলেও সৌহার্দ্য, শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখাই হওয়া উচিত এ নির্বাচনের মূল সৌন্দর্য।
আসন্ন নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক, সহজ ও গ্রহণযোগ্য করতে কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, বিপুল সংখ্যক ভোটারের কথা মাথায় রেখে অ্যাডভান্স ভোটিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। কানাডার মূলধারার নির্বাচনে অ্যাডভান্স ভোটিং একটি কার্যকর ও জনপ্রিয় পদ্ধতি। এতে ভোটাররা নির্দিষ্ট দিনের ব্যস্ততা, অসুস্থতা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা কর্মস্থলের কারণে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হন না। জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের মতো বড় সংগঠনের নির্বাচনে এই ব্যবস্থা চালু করা হলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে এবং নির্বাচন আরও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন ভোটিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বৃহত্তর টরন্টোর বিভিন্ন প্রান্তে ভোটাররা বসবাস করেন। অনেকের ছোট সন্তান আছে, অনেকের বয়স্ক পিতামাতা আছেন, আবার অনেকে রবিবারেও কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকেন। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্রে আসা সবার জন্য সহজ নয়। প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে এসব ভোটারও সহজে অংশ নিতে পারবেন। সংগঠনের ভেতরে অনেক দক্ষ আইটি পেশাজীবী রয়েছেন। তাঁদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় ভোটার যাচাই, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং স্বচ্ছতা বজায় রেখে একটি কার্যকর অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। একটি আধুনিক কমিউনিটি গড়তে হলে নির্বাচনের পদ্ধতিতেও সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ভোটারদের স্বাচ্ছন্দ্য ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সাহসী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, নির্বাচনের আগে তিন প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থীদের নিয়ে আমি একটি উন্মুক্ত ডিবেট আয়োজনের ইচ্ছে প্রকাশ করছি। সেখানে তিন সভাপতি প্রার্থী তাঁদের নিজ নিজ প্যানেলের নির্বাচনী অঙ্গীকার, কর্মপরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য তুলে ধরতে পারবেন। উপস্থিত ভোটাররা সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানটি লাইভ সম্প্রচার করা হলে ঘরে বসেও ভোটাররা প্রার্থীদের বক্তব্য শুনতে পারবেন এবং অনলাইনে প্রশ্ন করতে পারবেন। এতে প্রার্থীদের যোগ্যতা, প্রস্তুতি, নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংগঠন পরিচালনার পরিকল্পনা সম্পর্কে ভোটারদের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিন প্যানেল, ভোটার এবং কমিউনিটির সচেতন মহলের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
নির্বাচন কেবল পদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়। এটি নেতৃত্বের পরীক্ষা, দায়িত্ববোধের মাপকাঠি এবং সমাজসেবার প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের সুযোগ। জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের আসন্ন নির্বাচন যদি সৌহার্দ্য, শালীনতা, স্বচ্ছতা ও ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটি শুধু একটি সংগঠনের নির্বাচন থাকবে না, বরং পুরো বাংলাদেশ কমিউনিটির জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। প্রত্যাশা একটাই, যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সংগঠন পরিচালনা করবেন এবং প্রবাসী জীবনের ভেতরেও আমাদের সামাজিক ঐক্যের আলো আরও উজ্জ্বল করে তুলবেন।









