ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, শক্তিশালী হচ্ছে রাশিয়া

ওয়াশিংটন, ১১ এপ্রিল – যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক জোট ন্যাটোর প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরূপ মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিরক্ষা খাতে মিত্র দেশগুলোর তুলনামূলক কম ব্যয় নিয়ে তার ক্ষোভ এবং ডেনমার্কের অধীনস্থ গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির কারণে জোটটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই অস্বস্তি বিরাজ করছে। সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সম্ভাব্য যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই জোটের ফাটলকে নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প মিত্রদের এই সমর্থন না দেওয়ার বিষয়টিকে ন্যাটোর জন্য একটি কলঙ্ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে এই কলঙ্ক কখনোই মুছে যাওয়ার নয়। এর কয়েক ঘণ্টা পরই জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎস সুস্পষ্ট ভাষায় জানান যে এই সংঘাত ট্রান্স আটলান্টিক সম্পর্কের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে যে যুক্তরাষ্ট্র যদি জোট থেকে বেরিয়ে যায়, তবে এই সামরিক জোট আদৌ টিকে থাকতে পারবে কি না।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক এলিজাবেথ ব্রক জানান যে ট্রাম্প যতবার ন্যাটোকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরেন, ততবারই জোটটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো এবং ইউরোপ ও ন্যাটোর জন্য সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব ডিফেন্স জিম টাউনসেন্ড বলেছেন যে ন্যাটো আর কখনোই আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না এবং তারা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বিচ্ছেদের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে ট্রাম্প চাইলেই যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে পুরোপুরি বের করে নিতে পারবেন না। কারণ ডেমোক্র্যাটরা এই সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী এবং খোদ রিপাবলিকান পার্টির একাংশও ন্যাটোর পক্ষে অবস্থান করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়তে হলে মার্কিন সিনেটে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে, যা অর্জন করা ট্রাম্পের জন্য বেশ কঠিন। তবে ট্রাম্পের হাতে বিকল্প উপায় রয়েছে। ন্যাটোর চুক্তি অনুযায়ী কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
ফলে ওয়াশিংটন আদৌ মিত্রদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এছাড়া ইউরোপে মোতায়েন থাকা প্রায় ৮৪ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার ক্ষমতাও ট্রাম্পের রয়েছে। একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরান ইস্যুতে যেসব দেশ ওয়াশিংটনকে সহযোগিতা করেনি, সেসব দেশ থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প। ন্যাটোর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইউরোপের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা জোটের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতালির সাবেক ন্যাটো রাষ্ট্রদূত স্টেফানো স্টেফানিনি মন্তব্য করেছেন যে ন্যাটোকে দুর্বল করার জন্য ট্রাম্পের জোট ছাড়ার প্রয়োজন নেই, বরং তিনি শুধু এই সম্ভাবনার কথা বলে জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করেছেন। অন্যদিকে আটলান্টিক কাউন্সিলের এলিজাবেথ ব্রক মনে করেন যে ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের ক্রমাগত বিষোদ্গারের ফলে রাশিয়া আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ন্যাটো ঐক্যবদ্ধ থাকলেই কেবল তা রাশিয়ার জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে। কিন্তু রাশিয়া যখন এই জোটে ফাটল দেখবে, তখন তারা এক বা একাধিক ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজতেই পারে।
এস এম/ ১১ এপ্রিল ২০২৬









