মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের টোল বসানোর দাবি, আন্তর্জাতিক আইনে বাধা

তেহরান, ১০ এপ্রিল – ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্বন্দ্বের জেরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই উত্তেজনার মাঝে তেহরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং সেখান থেকে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে তারা ট্রানজিট ফি আদায় করবে। ইরান তাদের উপকূলবর্তী এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি তেলবাহী জাহাজ থেকে মাশুল নিতে চায়। তবে জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে।

তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কোনো প্রণালীতে এমন টোল আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ। পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সংঘাতের শুরুতে ইরান এই পথটি শত্রু জাহাজের জন্য বন্ধ করে দিলেও বর্তমানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছে। এই সময়ে তেহরান তাদের শান্তি প্রস্তাবের অংশ হিসেবে ১০টি শর্ত উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো হরমুজে টোল আদায়ের অধিকার। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই প্রণালী দিয়ে বিনামূল্যে তেল পরিবহন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ উপকূলবর্তী প্রণালী ব্যবহারের জন্য বিদেশি জাহাজের কাছ থেকে মাশুল দাবি করতে পারে না। আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে সব দেশের জাহাজের অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। কেবল পাইলটিং বা বন্দর সুবিধার মতো বিশেষ সেবা প্রদান করলেই নামমাত্র ফি নেওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের সাধারণ যাতায়াত মাশুল দাবি করা বৈশ্বিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। সুয়েজ বা পানামা খাল কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ায় সেখানে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকে এবং তারা ফি আদায় করতে পারে।

কিন্তু হরমুজ একটি প্রাকৃতিক প্রণালী হওয়ায় এখানে বাণিজ্যিকভাবে টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। তুরস্কের বসফরাস ও দার্দানেলস প্রণালী ১৯৩৬ সালের মন্ট্রেক্স কনভেনশন দ্বারা পরিচালিত হয়, যেখানে কেবল সেবামূলক কাজের জন্য ফি নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। সিঙ্গাপুর প্রণালীতেও কোনো দেশ মাশুল দাবি করে না। তাই ইরানের এই দাবিকে আধুনিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এটি সফল হলে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে গুঞ্জন উঠেছে যে, ইরান কিছু জাহাজ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে মাশুল আদায় শুরু করেছে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, অন্তত একটি জাহাজ দুই মিলিয়ন ডলার ফি দিয়ে যাতায়াত করেছে এবং তেহরান এই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে আদায়ের পরিকল্পনা করছে। তারা প্রতি ব্যারেল তেলের বিপরীতে এক ডলার টোল নেওয়ার কথাও ভাবছে। ওমানের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি প্রোটোকল তৈরির চেষ্টা করলেও ওমান আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হওয়ায় তাতে সম্মতি দেয়নি। ইরানের এই একতরফা সিদ্ধান্তে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার স্পষ্ট জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীকে জিম্মি করে রাখা যাবে না এবং এর অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাই হবে যেকোনো শান্তি চুক্তির ভিত্তি। জ্বালানি রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই মাশুল বড় অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। অনেকেই মনে করছেন, এই অঞ্চলের জ্বালানির বড় গ্রাহক হওয়ায় চীনের মধ্যস্থতাই এখন এই সংকটের একমাত্র কূটনৈতিক সমাধান হতে পারে।

এস এম/ ১০ এপ্রিল ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language