মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় লাফ

ওয়াশিংটন, ৩০ মার্চ – যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে, যেখানে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। সোমবার সকালে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম তিন শতাংশের বেশি বেড়ে এই পর্যায়ে পৌঁছায়। এর আগে ১৯ মার্চ দাম সাময়িকভাবে ১১৯ ডলার ছুঁয়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি এবং সরবরাহ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরান সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রস্তুতির ঘোষণা দেওয়ায় সংঘাতের উত্তাপ আরও বেড়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে মার্কিন সেনারা প্রবেশ করলে তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। একই সময়ে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার সম্ভাব্য প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিয়েছে।

এর ফলে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ ব্যাহত হচ্ছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের শঙ্কা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব এশিয়ার শেয়ার বাজারেও স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকের উভয় ক্ষেত্রেই চার শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খরচ বাড়ার পাশাপাশি অনেক দেশ জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না ছাড়লে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধের অবসানে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা এগোতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন। তবে তেহরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং প্রণালির ওপর নিজেদের অধিকার স্বীকৃতির পাল্টা শর্ত দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক না হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং তা ১২০ ডলার অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান সরবরাহ সংকটকে তারা নজিরবিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তবে এত উত্তেজনার মাঝেও সীমিত আকারে কিছু ইতিবাচক দিক দেখা যাচ্ছে। ইরান ধীরে ধীরে তাদের কিছু মিত্র দেশের জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দিচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, তাদের ২০টি পতাকাবাহী জাহাজকে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও গত সপ্তাহে জানিয়েছেন যে, ইরান মালয়েশীয় জাহাজগুলোকে প্রণালিটি অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সাতটি অ-ইরানি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। বুধবার এই সংখ্যা ছিল পাঁচটি এবং মঙ্গলবার ছিল চারটি। তবে যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও সময়ের প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এস এম/ ৩০ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language