
জীবন যেমন আধুনিক হয়েছে, মৃত্যুও পিছিয়ে নেই! এখন শুধু বাঁচাই নয়, “মরাটাও যেন স্টাইলিশ হয়”—এই মন্ত্রে সাজানো হচ্ছে শেষ বিদায়ের প্রতিটি মুহূর্ত। কফিনের ডিজাইন থেকে কবরস্থানের লোকেেশন, সবেতেই জাঁকজমক—যেন মৃত্যু কোনো ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটা “প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স”!
টেকনোলজি তো আছেই—”ডিজিটাল সমাধি” সার্ভিসে স্ক্যান করলেই QR কোড, ফটো, ভিডিও, এমনকি প্রিয়জনের ভয়েস মেসেজ শুনতে পাবেন কবরের পাথরে!
সম্প্রতি ইতালিয়ান একটি কাসকেট (কফিন) কোম্পানি কফিন-এর এক ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে হইচই ফেলে দিয়েছে। এই ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায় কফিনের সাথে অর্ধনগ্ন তরুণীদের ছবি। বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছাপানো এসব ছবি দেখে কারো কারো হয়তো কফিনের ভেতরে তাড়াতাড়ি ঢুকে যেতে মন চাইবে।
ক্যালেন্ডারটির পাতায় পাতায় বিভিন্ন ধরনের বাণীও লিপিবদ্ধ আছে। যেমন একটিতে লেখা-‘স্বপ্ন হউক সত্যি, অনন্তকাল ধরে যে আপনার অপেক্ষায়’। সুপার ইম্পোজ করে ছাপানো হয়েছে অপুর্ব এক সুন্দরী নারী কাসকেটে শুয়ে আছে, পাশেই যত্ন করে রাখা একটি বালিশ।
বহু রকমের বিজ্ঞাপন এ জীবনে দেখেছি কিন্তু এ রকম বিজ্ঞাপন কখনও চোখে পড়েনি। সেদিন টরন্টো স্টার পত্রিকায় বিশাল এক বিজ্ঞাপনের দিকে চোখ পড়লো। বিজ্ঞাপনটি একটি কবরস্থানের।

‘আপনি নিশ্চয় এমন একটি স্থানে আপনার সমাধি হোক চান না যেখানে আপনাকে স্মরণ করে আপনার পরিবার এবং বন্ধু বান্ধবদের যেতে কষ্ট হবে। অতঃপর আপনার সমাধিতে একটি ফুল দিতেও কেউ কোনোদিন আসবে না। এ কথা ভেবেই আমরা ডাউন টাউন টরন্টোর এমন একটি মনোরম জায়গা বেছে নিয়েছি। ছায়া সুশীতল, বৃক্ষশোভিত, বিশাল সরোবরের তীরে আপনার সমাধির স্থান আজই বেছে নিন। যোগাযোগ… ..’।
উত্তর আমেরিকায় কবরস্থান বা সমাধির জন্য বিজ্ঞাপন শুধু সংবাদপত্রেই নয়, বিলবোর্ড, অনলাইন, রেডিও এমনকি টিভিতেও দেয়া হয়।
আমরা সকলেই জানি জন্ম এবং বিয়ে হচ্ছে আনন্দ-উৎসবের আর মৃত্যু হচ্ছে শোক এবং দুঃখের। না, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন যারা মৃতুকে শোক এবং দুঃখের ঘটনা বলে মানতে রাজি নন। তারা চান, তাদের মৃত্যুটাও যেন আনন্দমুখর হয়। আগে থেকেই তারা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। আর এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন ফিউনারেল কোম্পানি। এছাড়া বিভিন্ন ইন্সুরেন্স কোম্পানিও শেষ বিদায়ের কিছু দায়-দায়িত্ব পালন করে থাকে। উত্তর আমেরিকার ফিউনারেল ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক বাজার মূল্য প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার।
মৃতদেহ সৎকারের জন্য ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় যে ব্যবস্থা রয়েছে তা দেখে বিস্মিত হয়েছি। যে লোক জীবনে লিমোজিন চড়েনি, যে লোককে কেউ চেনে না। সমাজে যার কোনো অবদান নেই এমন লোককেও মৃত্যুর পর রাজকীয়ভাবে সমাধিস্থ করা হয়। শুধু করে যেতে হবে ইন্সুরেন্স অথবা রেখে যেতে হবে অর্থ।
ফিউনারেল কোম্পানিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস রয়েছে। মৃত ব্যক্তি অথবা তার নিকট আত্মীয়ের আকাক্সক্ষা এবং সর্বোপরি পয়সা খরচ করতে পারলে অনেক কিছুই সম্ভব।

অনেকে মনে করেন মৃতদেহটি দেখে যেন অন্যের সুখ লাগে, আনন্দ লাগে। তাই সুন্দর নকশা করা একটি কফিনে লাশ এমবালমিং করে রাখা হয়। এমবালমিং হচ্ছে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় দেহকে সুরক্ষিত করা। একই সাথে পরিপাটি করে মুখমন্ডল ও দেহকে সাজানো।
নতুন স্যুট-টাই পরিয়ে মেকআপ করে, চুলে জেল লাগিয়ে মখমলের কাসকেটে যখন লাশ রাখা হয় তখন দেখে মনে হবে দেশের বরেণ্য এবং অর্থশালী ব্যক্তি বুঝি সুখনিদ্রায় শায়িত।
টাকা খরচ করলে আপনার কফিন বহনকারী গাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি রাখতে পারেন। আরও একটু খরচ করলে আপনার শোক অনুষ্ঠানে প্রচুর লোক সমাগমের ব্যবস্থা করা হবে। আপনি আরও চাইলে অর্থাৎ আরেকটু খরচ করলে আপনার শোক সভায় বক্তা হিসেবে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আসবেন এবং আপনার কর্মময় জীবন নিয়ে মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন যদিও তারা আপনাকে চেনেন না। এবং আপনি সমাজের গণ্যমান্য কোনো ব্যক্তিও নন।
কফিনের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়ের সাথে অর্ধনগ্ন নারীর ছবি দেখে আমার মতো অনেকেই বেহুশ হবার জোগাড়। জিজ্ঞেস করা হলো প্রস্তুতকারকদের-কেন তারা এ ধরনের প্রচারে নামালো। তাদের সোজা উত্তর- ‘গাড়ির বিজ্ঞাপনে যদি নারীর ছবি থাকতে পারে তবে কফিনের সাথে নারীর ছবি থাকতে অসুবিধা কোথায়?’
কাসকেট কোম্পানির প্রধান একজন কর্মকর্তা জানান, অনেকেই আমাদের এ ধারণাকে স্বাগত জানাতে পারছেন না। তারা বলছেন মৃত্যুর সাথে যৌনতার মিশ্রণ এক ধরনের ঠাট্টা। আবার অনেকে এ ধারণাকে ‘গ্রেট আইডিয়া’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন।

উত্তর আমেরিকায় সময়ের অভাবে অনেকে তার প্রিয়জনের সমাধি পরিদর্শনে যেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানি রয়েছে যারা আপনার পক্ষ থেকে আপনার প্রিয় ব্যক্তির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণসহ প্রতি সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করবে। এই সেবাকে বলা হয় ‘Graveside Floral Tributes’ বা ‘Eternal Flame Service’। আপনি চাইলে বছরে বিশেষ দিনে ফুল পৌঁছানোর প্যাকেজ (Mother’s Day, Father’s Day, Birthday, Death Anniversary) নিতে পারেন। আপনি যেভাবে চুক্তি করবেন তারা সে মোতাবেক সার্ভিস দেবে। অর্থাৎ পয়সা যত, সার্ভিস তত।
পরিবর্ধিত তথ্য:
“ড্রাইভ-থ্রু” সমাধি সেবা: আমেরিকায় কিছু কবরস্থান এখন “ড্রাইভ-থ্রু” সুবিধা দিচ্ছে, যেখানে আপনি গাড়ি থেকেই প্রিয়জনের সমাধিতে ফুল রাখতে পারবেন—ঠিক ফাস্ট ফুড অর্ডার করার মতো!
ই-কফিনের যুগ: ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহার করে কিছু কোম্পানি এখন “প্রি-প্ল্যানড ফিউনারেল” প্যাকেজ অফার করে, যেখানে আপনি নিজের কফিন ডিজাইন করে ভার্চুয়ালি “টেস্ট ড্রাইভ” করতে পারেন!
মৃত্যুর পরের সোশ্যাল মিডিয়া: “লাইফ আফটার ডেথ” নামের সার্ভিসে আপনি মৃত্যুর পরও অটো-পোস্ট দিতে পারবেন—আপনার জন্মদিনে পরিবারের ফেসবুকে চমক দিয়ে যাবেন একটি প্রি-রেকর্ডেড ভিডিও বার্তা দিয়ে!
সুইডেনের “বায়ো-কফিন”: পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে এখন মাশরুম ও শৈবাল দিয়ে তৈরি বিয়োগ্রেডেবল কফিনের চাহিদা বাড়ছে, যা মাটির সাথে মিশে গিয়ে গাছের পুষ্টি হয়!









