
আশির দশকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য মন্ট্রিয়ল ছিল একটি স্বপ্নের শহর। অনেকেই এখানে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে আসতেন। এখানকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আগত নবাগতদের বেশিরভাগই মনট্রিয়লে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে ওখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আর ঐ সময় থেকেই মন্ট্রিয়লের বাংলাদেশি কমিউনিটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে বাংলাদেশি গ্রোসারী, রেষ্টুরেন্টসহ নানান ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। বাংলাদেশিরা কাজ করতেন ফ্যাক্টরিতে, গার্মেন্টেসে, রেষ্টুরেন্টে। নতুন আগত বাংলাদেশীদের মধ্যে অনেক সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মীরাও পাড়ি জমায় মনট্রিয়লে। শুরু হয় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড। বাংলা নববর্ষ উদযাপন, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, নাটক, কবিতার আসর, কত কি! কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বৈচিত্র্যময় নগরী মনট্রিয়ল। এই আলো ঝলমলে শহরের বুকেই একদিন ঘটে যায় এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, যা কেবল মন্ট্রিয়লের বাংলাদেশি অভিবাসীদের নয়, গোটা কানাডাকে কাঁপিয়ে তোলে।
১৯৯০ সাল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে, মিলিয়া আবরার তার পরিবারসহ বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পাড়ি জমায়। তার বাবা মোহাম্মদ আবরার ছিলেন একজন প্রকৌশলী, মা ফারহানা আবরার ছিলেন গৃহিণী। ছোট ভাই মিলকি ফারুক ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। নতুন দেশে এসে মিলিয়া খুব দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন।
মিলিয়া ডসন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি সংগীত, নৃত্য ও নাট্য চর্চায় ছিলেন নিবেদিত। কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে তিনি সমাজবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। স্মার্ট, হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত মিলিয়া খুব সহজেই বন্ধুদের প্রিয় হয়ে ওঠেন। কমিউনিটির মধ্যেও তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। তার উপস্থিতি যে কোনো অনুষ্ঠানে এক আলাদা উজ্জ্বলতা নিয়ে আসত।

২০ অক্টোবর ১৯৯৮। শরতের শেষ প্রান্তে মন্ট্রিয়লের বাতাস ছিল একটু ঠান্ডা, পাতাঝরা রাস্তা এক অদ্ভুত রঙে সেজেছিল। বিকেল চারটার কিছু পর, মিলিয়া তার পরিচিত একজনের সঙ্গে অ্যাংরিগনন পার্কে যান। এই পার্কটি নগরীর অন্যতম সুন্দর পার্কগুলোর একটি, যেখানে অনেকেই বিকেলের আড্ডা জমাতে বা একান্তে কিছু সময় কাটাতে আসেন। কিন্তু সেদিন সেখানে ঘটে এক লোমহর্ষক ঘটনা। সন্ধ্যার কিছু আগে, পার্কের নির্জন এক স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মিলিয়াকে। তার শরীরে ২০টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং মুখে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। হত্যাকারী এতটাই নৃশংস ছিল যে সে নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, মিলিয়া যেন কখনো কথা বলতে না পারে, যেন তার পরিচয়টুকুও মুছে ফেলা যায়।
খবর পাওয়ার পর মন্ট্রিয়ল পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তবে হত্যাকারী পালিয়ে যায়। পুলিশের সন্দেহ হয় এক বাংলাদেশি যুবকের ওপর, যিনি মিলিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষায় (lie-detector test) তিনি ব্যর্থ হন। পুলিশের সন্দেহ থাকলেও যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এরপর হত্যাকারী টরন্টোতে চলে আসে এবং স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে মিশে যায়।
মন্ট্রিয়লের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আজও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এক অদৃশ্য ক্ষতের মতো দগদগে হয়ে আছে। এখনো মিলিয়ার হত্যাকারী অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে, বিচারহীনতার এই ভার যেন আমাদের বিবেককে কুরে কুরে খাচ্ছে। অপূর্ণতার এই করুণ গল্পটির সাথে গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি মিলিয়াকে।
••• লেখাটি ‘উত্তর আমেরিকার চালচিত্র‘গ্রন্থ থেকে সংকলিত।









