‘একমাত্র ছেলের বুকে পাষণ্ডরা গুলি মেরেছে, বুকটা ফুটো হয়ে গেছে’

ঢাকা, ২৯ জুলাই – ‘বাড়িতে আইলে এই ঘরে আর কেডায় থাকব, আমারে কেডা ফোন করে বলবে দাদি তোমার লাইগ্যা কি আনমু, তোমার ওষুধ লাগবনি, ওরে সাগর তুই কইরে, আমার আগে তুই কেমনে মরলি? তরে কেডা গুলি করে মারল!’ ঘরের দরজায় বসে নাতির ছবি হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এ কথা বলেন বৃদ্ধা রাজিয়া খাতুন।
গত ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ চলাকালে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মো.সাগর মিয়া (১৯)। পরে তার বাবা পরদিন শনিবার দুপুরে সাগরের মরদেহ নিয়ে আসেন গ্রামের বাড়ি দেবিদ্বারে। দুপুরে জানাজা শেষে বাড়ির একটি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
নিহত সাগর মিয়া দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের বড়শালঘর গ্রামের বাসিন্দা। বাবা, মা ও দুই বোন নিয়ে মিরপুর ১ নম্বর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সবজি বিক্রি করতেন সাগর মিয়া।
সাগরের বাবা আবু হানিফ মিয়া বলেন, ‘শুক্রবার গোলাগুলির দিন আমি বারবার বলছিলাম, বাবা তুই আজকে যাইস না, আমার ওষুধ ও ঘরে বাজার ছিল না বলে ভ্যান নিয়ে বের হইছিল সাগর। এরপর আমি বিকেলে ফোন করছিলাম, সে আমারে বলে, ‘‘আমি মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আছি, তুমি চিন্তা কইর না।” আমি বলছি, তুই বাসায় চলে আয়। তখন সে আমাকে বলে, ‘‘বাবা আমি আসতে পারব না, এখানে অনেক গোলাগুলি হচ্ছে”।’
সাগরের বাবা আরও বলেন, ‘পরে সন্ধ্যায় ফোন দিলে তার নম্বর বন্ধ পাই। রাত ৮টার দিকে আমি সাগরকে খুঁজতে বের হই। তখনও বাহিরে টিয়ারসেল ও গোলাগুলি চলছিল। পরে রাত ১০টার দিকে আমি মিরপুর ১০ নম্বরের মোড়ে এসে সাগরের খোঁজ নিলে কেউ একজন বলেন, ‘‘আপনার ছেলে কি সবজি বিক্রি করত।” আমি, হ্যাঁ বললে, তিনি একটি প্রাইভেট হাসপাতালের নাম বলে বলল, ওখানে গিয়ে খোঁজ নেন, মিরপুরে যারা আহত হইছে এদের প্রায় সবাই ওই হাসপাতালে আছে। আমি দৌড়ে ওই হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ করলে রাত ৩টার পর আমার ছেলের মরদেহ দেখানো হয়। এরপর আমি আর কিছু বলতে পারব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলের বুকে পাষণ্ডরা গুলি মেরেছে, বুক ফুটো হয়ে গেছে। আমার একটি মাত্র ছেলে তাকেও আমার কাছ থেকে কেঁড়ে নিল। আমি অসুস্থ কখন মারা যাই ঠিক নাই, আমার পুরো সংসারটা শেষ হয়ে গেল। তার মা ও দুই বোন রয়েছে তাদের দেখাশুনা কে করবে।’
সাগরের ফুফু সাহিদা আক্তার জানান, ‘সাগর আমার একমাত্র ভাতিজা। বাড়িতে আসলে এই ঘরেই থাকত। সাগরের বাবা অনেকদিন থেকে কেডনি রোগে ভুগছেন। তার চিকিৎসার জন্য সাগর লেখাপড়া বন্ধ করে ঢাকায় সবজি বিক্রি করত। সংসারের একমাত্র রোজগার করত সাগর। সন্তান হারিয়ে আমার ভাই বার বার বেহুশ হয়ে পড়ছে।’
দাদি রাজিয়া খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার নাতি বাড়িতে আইলে দুই একদিন থাইক্যা ঢাহা যাওয়ার সময় আমার লগে দুষ্টুমি করত। বলত, ‘‘দাদি তোমারে পরের বার এসে বিয়ে করমু, তুমি রেডি থাইক,” এই বলে হাসাহাসি করে আমার কাছ থেকে বিদায় নিত। এলাকায় সকল ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। আমার নাতিরে ফিরাই আইন্না দাও, কেডা আমার নাতিরে মারল। তার তো শত্রু নাই।’
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.নয়ন মিয়া বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দেবিদ্বারে তিনটি মরদেহ আসার খবর পেয়েছি। ঢাকায় নিহত সাগরের বাড়ি বড়শালঘর গ্রামে। নিহত পরিবারগুলোর খোঁজ-খবর রাখছি।’
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নিগার সুলতানা বলেন, ‘ঢাকায় সহিংসতায় নিহত তিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে। আমি নিজে তাদের বাড়িতে গিয়ে সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা তুলে দিয়েছি। সাগরের পরিবারকেও সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।’
সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ২৯ জুলাই ২০২৪









