মরণফাঁদ নাকি স্বর্গের স্পর্শ? ৩৬৫ মিটার উঁচুতে পাহাড়ে ঝুলে থাকা কাচের ক্যাপসুলে অবিশ্বাস্য রাত

ভাবুন তো এমন এক রাতের কথা—মাথার ওপর দিগন্তজোড়া তারাভরা আকাশ, চারপাশে মেঘের দেশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল আন্দিজ পর্বতমালা, আর পায়ের নিচে শত শত ফুটের গভীর খাদ! সেখানে আপনি শুয়ে আছেন এক স্বচ্ছ কাচের ক্যাপসুলে, যা ঝুলছে একদম খাড়া পাহাড়ের গায়ে। রূপকথার গল্পের মতো শোনালেও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর ‘সেক্রেড ভ্যালি’তে (Sacred Valley) বাস্তবেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই হোটেল। তবে এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য উপভোগের মূল শর্ত একটিই—আপনার থাকতে হবে হিমালয়ের মতো সাহস এবং পাহাড় ডিঙ্গানোর শারীরিক সক্ষমতা!
মৃত্যুর মুখোমুখি চেক-ইন: যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই চরম শিহরণ
বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু রোমাঞ্চকর এই হোটেলের নাম ‘স্কাইলজ অ্যাডভেঞ্চার স্যুইটস’ (Natura Vive Skylodge Adventure Suites)। মাটি থেকে প্রায় ৩৬৫ মিটার (১,২০০ ফুট) উঁচুতে খাড়া পাথুরে পাহাড় আঁকড়ে ঝুলে রয়েছে অ্যালোয় ও স্বচ্ছ পলিকার্বোনেটে তৈরি কয়েক জোড়া ঘুমানোর ক্যাপসুল।
তবে সাধারণ হোটেলের মতো গাড়ি থেকে নেমে সোজা ঘরে ঢুকে যাওয়ার কোনো সুযোগ এখানে নেই। হোটেলে চেক-ইন করাটাই এখানে মূল অ্যাডভেঞ্চার! অতিথিদের পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয় ‘ভায়া ফেরাটা’ (Via Ferrata) পদ্ধতিতে। কোথাও খাড়া পাথরে লাগানো লোহার ধাপ, কোথাও সরু কাঠের সিঁড়ি, আবার কোথাও ঝুলন্ত তারের ওপর ভারসাম্য রেখে এগোতে হয়। নিরাপত্তাবেল্ট, হারনেস ও ক্যারাবিনার আঁকড়ে ধরে প্রায় ২০০ মিটার গভীর বিপজ্জনক খাদের ওপর টানা ২০ মিটার দীর্ঘ সরু তারের সেতু পার হতে গিয়ে সবচেয়ে সাহসী মানুষের বুকও দুরুদুরু করে ওঠে।
বিবিসির চোখে এক দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা
সম্প্রতি ‘বিবিসি ট্রাভেল’ (BBC Travel)-এ এই হোটেলে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এক নারী পর্যটক। উচ্চতাভীতি (Acrophobia) থাকায় স্বামীর সঙ্গে যাত্রা শুরুর মুহূর্তেই চরম আতঙ্কে জমে গিয়েছিলেন তিনি। তবে গাইডদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও সহযোগিতায় প্রায় দুই ঘণ্টার কঠিন চড়াই পেরিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,২০০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে পৌঁছান তারা। পাহাড়ি ট্রেইলের শারীরিক ধকল এতটাই বেশি ছিল যে চূড়ায় পৌঁছানোর পর একপ্রকার ক্লান্তিতে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন তারা।
কিন্তু ক্যাপসুলে পা রাখার পরই বদলে যায় সব দৃশ্যপট! কাচের দেয়াল ও ছাদ দিয়ে একপলকেই চোখে পড়ে রহস্যময় ইনকা উপত্যকা এবং বুক চিরে বয়ে যাওয়া উরুবাম্বা নদীর চোখঝলসানো সৌন্দর্য।
তারার মেলা ও প্রাচীন ইনকা সভ্যতার মায়াজাল
ক্লান্ত বিকেলের পর অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী চার পদের সুস্বাদু পেরুভীয় খাবার ও স্থানীয় পানীয়। খাওয়াদাওয়া শেষে আবারও নিরাপত্তাবেল্ট আর লাইফলাইন আটকে পাহাড়ের পথ ধরে পৌঁছাতে হয় নিজস্ব ক্যাপসুলে। ৩টি বিছানা এবং উপত্যকাসুখী ৬টি জানালাযুক্ত এই ঘরের সবচেয়ে বড় চমক রাতের আকাশ।
শহরের কোনো কৃত্রিম আলো না থাকায় রাতের আকাশে স্পষ্ট ফুটে ওঠে ‘মিল্কিওয়ে’ বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ। ইনকা সভ্যতার লোকগাথা টেনে স্থানীয় গাইডরা জানান, প্রাচীন ইনকাদের বিশ্বাস ছিল নিচে বয়ে চলা এই উরুবাম্বা নদীটি আসলে রাতের আকাশের ছায়াপথ বা মিল্কিওয়েরই এক পার্থিব রূপ! পাহাড়ের কাচের ঘরে শুয়ে যেন মনে হয় তারাদের রাজ্যেই রাত কাটছে।
চেক-আউটেও চমক: জিপলাইনে চেপে নিচে ফেরা!
শুধু উঠার পথই নয়, হোটেল থেকে নামার পদ্ধতিটিও রোমাঞ্চে ঠাসা। পরদিন সকালে নাশতা পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের অ্যাডভেঞ্চার। নিচে নামার জন্য পাহাড়ি পথ হেঁটে নামার সুযোগ নেই; ব্যবহার করতে হয় টানা ৬টি জিপলাইন (Zipline)।
১৫০ মিটার থেকে শুরু করে ৭০০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ এসব জিপলাইনে চেপে শূন্যে ভাসতে ভাসতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই অতিথিরা পৌঁছে যান নিচে। প্রকৃতির এত কাছে থেকে এমন ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে পর্যটকদের শুধু টাকার থলি নয়, সঙ্গে থাকতে হবে একবুক সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
এনএন/ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬







