জাতীয়

চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে দরিদ্র হয়েছেন ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ: স্বাস্থ্য অর্থনীতির চাঞ্চল্যকর গবেষণা

ঢাকা, ২৯ অক্টোবর – ওষুধ কেনা, রোগ নির্ণয় আর চিকিৎসকের ফি মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে দেশের লাখ লাখ পরিবার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, কেবল চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়েই ২০২২ সালে দেশের প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।

সামগ্রিক দেশের দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমলেও চিকিৎসায় নিজস্ব খরচের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট (এইচইইউ)-এর সদ্য প্রকাশিত এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং সুইডিশ দূতাবাসের সহযোগিতায় পরিচালিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণার কিছু চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য:

দারিদ্র্যসীমার নিচে পতন: ২০২২ সালে চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬.৪ শতাংশ বা ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। ২০০৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৬ লাখ (জনসংখ্যার ৩.৯ শতাংশ)।

আর্থিক সংকটে পড়ার হার: অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর হাতে থাকা আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি চিকিৎসায় ব্যয় করতে হলে তাকে আর্থিক সংকট বলা হয়। ২০০৫ সালে এই হার ছিল ২৮.২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১.৭ শতাংশে (বিশ্বজুড়ে গড় ২৬ শতাংশ)।

বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়: পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি চিকিৎসায় খরচ হলে তাকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় বলা হয়। ২০০৫ সালে এই হার ১২.৫ শতাংশ থাকলেও ২০২২ সালে তা লাফিয়ে ৩২.১ শতাংশে পৌঁছেছে।

মাসিক চিকিৎসাব্যয় দ্বিগুণ: মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করার পরও ২০০৫ সালে একটি পরিবারের মাসিক গড় চিকিৎসাব্যয় ১,২৪১ টাকা থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৩,২৩৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া চিকিৎসায় নিজস্ব ব্যয় হয়েছে এমন পরিবারের অনুপাত ৫২.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯২.৭ শতাংশে ঠেকেছে।

কেন এই সংকট? ওষুধের পেছনেই বাড়ছে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাব্যয়ের সিংহভাগই চলে যায় ওষুধ কেনা, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা (ল্যাব টেস্ট), হাসপাতালে ভর্তি এবং ডাক্তারের ফি মেটানোর পেছনে। বিশেষ করে বহির্বিভাগের চিকিৎসার জন্য ফার্মেসির ওপর নির্ভরতা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে ৩২.৫ শতাংশ মানুষ ফার্মেসি থেকে সরাসরি চিকিৎসা বা ওষুধ নিতেন, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫.৪ শতাংশে।

আর্থিক সংকটের এই মারত্মক প্রভাবে সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন গ্রামীণ ও দরিদ্র মানুষ:

বিত্তহীনদের দুর্ভোগ: ২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৯০.৮ শতাংশই চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। অথচ ধনী ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৩.৬ শতাংশ।

গ্রাম বনাম শহর: গ্রামাঞ্চলের ৪৭.৯ শতাংশ মানুষ এই সংকটে পড়লেও শহরাঞ্চলে এই হার ছিল ২৮.২ শতাংশ।

বিভাগীয় বৈচিত্র্য: ২০০৫ সালে বরিশালে আর্থিক সংকটে পড়ার হার সবচেয়ে কম (২২.৫ শতাংশ) থাকলেও ২০২২ সালে সেই বিভাগেই তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৫৯.১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

সরকারি হাসপাতালের সুফল কি গরিবের কাছে পৌঁছাচ্ছে?

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধান ভরসা হলেও সরকারি খাতের অংশ কিছুটা কমেছে। ২০১৬ সালে যেখানে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর হার ছিল ৬১.3 শতাংশ, ২০২২ সালে তা কমে ৫৬ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার হার ৩৬.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২.৫ শতাংশ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন থাকলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ের সুবিধা পুরোপুরি তাদের অনুকূলে যাচ্ছে না।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, বিগত সময়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের শোচনীয় অবস্থার বাস্তব চিত্রই এই গবেষণায় ফুটে উঠেছে। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে সরকার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তিনি।

সংকট উত্তরণে প্রধান সুপারিশসমূহ:

১. চিকিৎসাব্যয় কমাতে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন ও বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো।

২. প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বিনামূল্যে বা সুলভে নিশ্চিত করা।

৩. দীর্ঘস্থায়ী বা জটিল রোগের জন্য নিয়মিত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা।

৪. সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা ও সম্পদ মাঠপর্যায়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো শতভাগ নিশ্চিত করা।

এনএন/ ২৯ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language