তেজগাঁওয়ে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে সংগঠনের পরিকল্পনার তথ্য

ঢাকা,১৩ অক্টোবর- বাংলাদেশে নতুন একটি জঙ্গিবাদী দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। নতুন এই জঙ্গিবাদী দলের নাম ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’। সংগঠনটির সঙ্গে বিদেশি জঙ্গি দলের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সম্প্রতি তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘তেজগাঁও থেকে হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।’ তবে বাংলাদেশ সরকার সব ধরনের জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ কঠোর হাতে বন্ধ করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স রয়েছে।’
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও কলেজের একটি মসজিদ থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদে গোপন বৈঠক করার সময় তাদের আটক করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মসজিদে পুলিশের এই অভিযানের কথা সাংবাদিকদের জানান। তেজগাঁওয়ে জঙ্গিবাদে জড়িত সন্দেহে এসব ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। এর আগে জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্ক নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সতর্ক করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তেজগাঁওয়ের ওই মসজিদে কথিত বৈঠক চলার সময় তাদের আটক করা হয়। যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর কর্মকর্তারা তাদের সিটিটিসির হেফাজতে নেন। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মৌলবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীদের তৎপরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পর্দার আড়াল থেকে বিদেশি শক্তি ও ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ে জঙ্গি গ্রেফতারের পরদিন, ১৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি পিকআপেও আগুন দেওয়া হয়। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এর পরের দিন, রবিবারও রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, নির্বাচনে পরাজিত শক্তিই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মদদ দিচ্ছে। তবে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, ‘দেশে জঙ্গি রয়েছে এবং জঙ্গি তৎপরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে সরকার কাজ করবে।’ সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। তবে সরকারকে বিপাকে ফেলতে বিরোধী পক্ষ জঙ্গিবাদীদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার এই কর্মকাণ্ডে মানুষের নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই অনেক জঙ্গি খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্ত কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া তিনজন কট্টর জঙ্গি নেতাকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে একাধিক জঙ্গিবাদী মামলা ছিল। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগও ছিল। এরই মধ্যে তাদের মধ্যে ৬ জনকে আবার গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি তিনজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজিপ্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও জানা গেছে, নরসিংদী কারাগার ভেঙে অন্তত ২৭ জন জঙ্গি পালিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অন্তত ৬৯০ জন বন্দি পালিয়ে যায়। তাদের অনেকেরই এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কারাগার থেকে পালানো জঙ্গিরা মৌলবাদীদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশে নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করাই তাদের লক্ষ্য।
তেজগাঁও থেকে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে নতুন সংগঠন গড়ে তুলে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনা করেছে জঙ্গিরা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সামনে আসার পর উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ আবারও বেড়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এখনই পরিস্থিতিকে উগ্রবাদের উত্থান হিসেবে দেখার মতো তথ্য নেই। সম্ভাব্য তৎপরতার ওপর নজরদারি চলছে। অন্যদিকে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ মানুষ এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। তাদের মতে, দেশকে উগ্রবাদমুক্ত করতে হলে শুরুতেই জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গিবাদীদের তৎপরতা চলছে। বিদেশি অর্থ ও সহায়তা নিয়ে তারা ধর্মের নামে নিজেদের সংগঠনের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত প্রায় দুই বছরে এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখন তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, এমন কিছু আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর মধ্যেও জঙ্গিবাদীদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছর চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান পাওয়া গেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি আস্তানায়। এ ঘটনার পর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত টিটিপির পক্ষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীরও একজন সদস্য কাজ করছিলেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীতেও জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একইভাবে মাদ্রাসার মাধ্যমে ছোট ছোট শিশুদের মনে জঙ্গিবাদের বীজ বপন করাও বিপজ্জনক। এসব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতেই হবে। এ জন্য আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
এস এম/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬







