জাতীয়

সরকারের নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও জাটকা সংরক্ষণে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা

প্রযুক্তির ব্যবহার ও জাটকা সংরক্ষণে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা

ঢাকা,১৩ অক্টোবর, জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জাটকা নিধন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান জোরদার, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, গবেষণা বাড়ানো এবং জেলেদের জন্য সরকারি বিশেষ বরাদ্দ ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ)-এর পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা ও নাব্যতা বজায় রাখা, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, মোহনা ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ আহরণের ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের জীবিকা ও ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ইকোসিস্টেম এবং ন্যাচারাল সাকসেশনের কারণে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের উৎপাদনে উত্থান-পতন হতে পারে। এ নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন একটি প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে। এ প্রকল্পে আইনের প্রয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রকল্পটি চালু হবে। একই সঙ্গে এবার জেলেদের জন্য ভিজিএফ কার্ড বা বরাদ্দের সংখ্যাও বাড়িয়েছে সরকার।

ইলিশ গবেষকরা বলছেন, ভারতের গুজরাটে উৎপাদন বাড়ার কারণ নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও গুজরাটের নদী এবং মোহনার পরিবেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণও করতে হবে। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো, প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচলের পরিবেশ রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন করে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আরেকটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। খুব শিগগিরই নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে এর কার্যক্রম শুরু হবে। ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের এ প্রকল্পে ইলিশের উৎপাদন ও সংরক্ষণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং ভিজিএফের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়গুলো রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভিজিএফ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরও ইলিশ আহরণের পরিমাণ কম বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ইকোসিস্টেম এবং ন্যাচারাল সাকসেশনের কারণে এবারও ইলিশের উৎপাদন কমের দিকে রয়েছে। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে আগামী বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এটি সবার দায়িত্ব। সবাই মিলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং জেলেরা দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবেন।

তিনি বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ ও জিআই পণ্য। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যেকোনো মূল্যে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা বলেছেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়।

তিনি বলেন, জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পানি দূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ—সব মিলিয়ে ইলিশ সম্পদের ওপর চাপ তৈরি করছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫.২৯ লাখ টন, যার আনুমানিক মূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ার পর সর্বশেষ হিসাবে তা কমে যাওয়ায় ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সরকারি নথিতে শিল্প ট্রলারের জন্য ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে মাছ ধরার নিয়ম রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত গভীরতার সীমার ভেতরে ট্রলিং করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল বা অনুপযুক্ত জাল ব্যবহার করলে একসঙ্গে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের মাছ ধরা পড়ে। এর ফলে ইলিশের ছোট মাছসহ অন্যান্য মাছও প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই ধরা পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ রক্ষায় কার্যকরভাবে আইন বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মনে করেন ড. মাসুদ রানা। তিনি বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। একটি প্রজননক্ষম মা ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে তার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক ইলিশ জন্ম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলেই হবে না, নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে টহল, নৌযান পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি নদীতে পানি দূষণ, বর্জ্য ফেলা, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

তার মতে, কোথায় ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ে, কোন সময়ে বেশি আসে এবং পরিবেশের কী ধরনের পরিবর্তন তাদের প্রজননে প্রভাব ফেলে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।

স্যাটেলাইট ও জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের বিচরণ, প্রজনন ও নার্সারি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা যেতে পারে। এআই ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর প্রবাহ, ক্লোরোফিল এবং অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইলিশের চলাচল ও সম্ভাব্য সমাগমের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া নদী ও মোহনায় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সেন্সর ব্যবহার করে পানির গুণাগুণ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ, ডিএনএ ও হাইড্রোঅ্যাকুস্টিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের উপস্থিতি ও মজুত নির্ণয় এবং ড্রোন ও এআইভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

পাশাপাশি জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় স্মার্ট ফিশিং গিয়ার, ডিজিটাল ক্যাচ ডেটাবেজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা হলে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি ‘স্মার্ট হিলসা ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ইলিশের প্রাকৃতিক মজুত সংরক্ষণ, অবৈধ মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

ভারতের গুজরাট রাজ্যের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। গুজরাটে উৎপাদন বাড়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিবৃষ্টির ফলে নর্মদা নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়া, মোহনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তন, ইলিশের চলাচলের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং মৌসুমি মাছের প্রাপ্যতা। গুজরাটের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বাংলাদেশের ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এবং মোহনার পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করেন ড. মাসুদ রানা।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দেশে গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছে। ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন ইলিশ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা শুরু হয়। এরপর প্রতি অর্থবছরে উৎপাদন ১০ থেকে ২০ হাজার টন করে বেড়েছে। তবে গত দুই বছর ধরে উৎপাদন কমছে। দেশে প্রতিবছর সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা হলে তা টেকসই উৎপাদনের সীমার মধ্যে থাকবে।

তার মতে, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচারে জাটকা নিধন। মা ইলিশ রক্ষায় অক্টোবরে যে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা এখনো যথাযথ আছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা গবেষণা করে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, অতীতে কয়েকটি উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাবে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছিল। এসব উদ্যোগের মধ্যে ছিল ২২ দিন মা ইলিশ রক্ষা, ৮ মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ রাখা, মার্চ ও এপ্রিলে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, সাড়ে ৬ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের জাল নিষিদ্ধ করা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের চালসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া। এ ছাড়া ২০০৫ সালে পাঁচটি অভয়াশ্রম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন এসব অভয়াশ্রমের পুনর্মূল্যায়ন এবং সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি।

অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ইলিশ ডিম ছাড়ার পর মার্চ-এপ্রিলে জাটকা ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যেতে থাকে। এ সময় নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে এবং উপকূলীয় সাগরে আর্টিসানাল ট্রলারের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে জাটকা ধরা হয়। এসব ট্রলার ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে। এর ফলে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। জাটকা নিধন বন্ধে সরকারকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি নদী দখল ও দূষণের কারণে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হওয়া এবং নাব্যতা সংকটের ফলেও ইলিশ ঠিকমতো বড় হতে পারছে না।

মৎস্যবিজ্ঞানীদের বক্তব্যের সঙ্গে উপকূলের জেলেদের অভিজ্ঞতারও মিল পাওয়া যায়। বিষখালী নদীতে ইলিশ ধরা কয়েকজন জেলে হলেন মো. লিটন হোসেন, মো. কাইয়ুম ও নিরু খান।

তাদের ভাষ্য, ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে সেগুলো ধরে ফেলা হয়। জাটকা নিধনের প্রথম ধাপে একেবারে ছোট বাচ্চা ধরা হয়, যা স্থানীয় বাজারে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বিক্রি হয়। পরের ধাপে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জাল দিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরা হয়। শেষ ধাপে বড় ট্রলিং ট্রলার এবং কাঠের তৈরি রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জাল দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা হয়। এর ফলে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ছাড়াও নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলেরা ছোট ইলিশ ধরে আনছেন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংকটন) রয়েছে। মেঘনা নদীতে এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর অন্যতম বড় কারণ নদীদূষণ। ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। এর প্রভাব ইলিশের আকৃতির ওপরও পড়ছে।

উল্লেখ্য, ইলিশ শুধু জাতীয় অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, উপকূলীয় জেলে, মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠী এবং উপকূলের সাধারণ মানুষের জীবিকার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন।

ইলিশে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠাপানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে এবং ইলিশ আহরণে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ মাছকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয়।

এস এম/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language